• শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

উৎসবের উল্লাসের আড়ালে ৫০–৭০ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব

খাদেমুল ইসলাম, দিনাজপুর / ৪৯ জন দেখেছেন
আপডেট : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

কেউ বলছে “লিচু উৎসব ” কেউ বলছে “লিচুর জমজমাট বিকিকিনি”, আবার কোনো কোনো সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী লিচুর সাফল্যের নানা গল্প। মৌসুমজুড়ে লাল আভায় মোড়ানো এই মিষ্টি ফলকে ঘিরে ছিল উৎসবের আনন্দ, কৃষকের পরিশ্রম, ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা এবং হাজারো মানুষের জীবিকার এক বিশাল অর্থনৈতিক চক্র।

কিন্তু উৎসবের রঙিন আবহের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক নীরব বাস্তবতা। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, অব্যবস্থাপনা ও বাজার কাঠামোর দুর্বলতার কারণে দিনাজপুরের এই ঐতিহ্যবাহী “লাল অর্থনীতি” এবারের মৌসুমে হারিয়েছে আনুমানিক ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকার সম্পদ।

মুকুল থেকে বাজার—ক্ষতির শুরু প্রকৃতির খেয়ালে
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুকুল আসার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব এবং প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ গাছে পর্যাপ্ত মুকুল না আসার কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ফলে এবারের মৌসুমে দিনাজপুর অঞ্চলে লিচুর মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩৬ হাজার থেকে ৪১ হাজার মেট্রিক টন।
তবে উপজেলা কৃষি বিভাগের মতে, কোনো এলাকায় উৎপাদন কম হলেও অন্যত্র ফলন বেশি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক গড় উৎপাদনে খুব বেশি পার্থক্য দেখা যায়নি। তবে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে এবং তা মোকাবিলায় গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির বিকল্প নেই বলেও তারা মনে করেন।
গাছের ডাল থেকে ভোক্তার হাত—পথেই হারিয়ে গেল কোটি টাকার লিচু।

লিচু চাষী ও ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে প্রায় ১০ শতাংশ লিচু গাছেই ঝরে পড়ে বা নষ্ট হয়েছে। আবার প্রচলিত পদ্ধতিতে লিচু সংগ্রহ, বহন ও প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার কারণে আরও ৫ থেকে ৭ শতাংশ লিচু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অর্থাৎ মোট উৎপাদনের প্রায় ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ লিচু বাজারজাত করা সম্ভব হয়নি। পরিমাণের হিসাবে তা প্রায় ৫ হাজার ৪০০ থেকে ৭ হাজার মেট্রিক টন। গড় বাজারমূল্য প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা ধরলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকা।

লাল অর্থনীতির অন্তরালের সংকট
সিন্ডিকেটের ছায়া
লিচু বাজারে প্রভাবশালী কিছু গোষ্ঠীর মূল্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে প্রকৃত উৎপাদক অনেক সময় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

মাঠ পর্যায়ে সেবার ঘাটতি
কৃষকদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের সেবায় অবহেলা ও সময়োপযোগী পরামর্শের অভাব রয়েছে।

বিপণন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের জন্য আধুনিক বাজার, সংরক্ষণাগার, আবাসন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাব এখনো রয়ে গেছে।

গবেষণার অভাব
তাপমাত্রা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন, মুকুল ঝরা ও পাকা লিচু ঝরে পড়া রোধে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা এখন সময়ের অন্যতম দাবি।

কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তার সংকট
ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সুদমুক্ত সহায়তা এবং সরকারি প্রণোদনার ব্যবস্থা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব
লিচু সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য আধুনিক কৃষি যন্ত্রের অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ফল ক্ষতির মুখে পড়ছে।

কালীতলা লিচু বাজারের বেহাল চিত্র
দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী কালীতলা লিচু বাজারে পচা বর্জ্যের দুর্গন্ধ, ড্রেনেজ সংকট এবং ব্যবসায়ীদের থাকা-খাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক বাইরের ব্যবসায়ী আগ্রহ হারাচ্ছেন। আধুনিক লিচু মার্কেট নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়
লিচু পরিবহনের পথে বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত অর্থ আদায় ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধি করছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনৈতিক চক্রে।

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ
বর্ধিত তাপমাত্রায় লিচুর ক্ষতি কমাতে গবেষণা, আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি, ভর্তুকি ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক-ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।

লাল রঙের ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই সময় উদ্যোগের
দিনাজপুরের লিচু শুধু একটি ফল নয়; এটি একটি অঞ্চলের পরিচয়, সংস্কৃতি, আবেগ এবং শত শত কোটি টাকার মৌসুমি অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। তাই শুধু “লিচু উৎসব” উদযাপন করলেই দায় শেষ হবে না। এই লাল অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত বাজার অবকাঠামো, কৃষকবান্ধব নীতি এবং সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা।
লিচুর লাল আভা যেন শুধু উৎসবের রঙ না হয়ে ওঠে কৃষকের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের প্রতীক—সেই প্রত্যাশাই আজ দিনাজপুরের মানুষ ও সংশ্লিষ্ট সবার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd