• বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০১:১১ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]

লবণের স্তূপে ১১ শতাংশ, অজানা পথে বাকি ৮৯ শতাংশ চামড়া

খাদেমুল ইসলাম, দিনাজপুর / ৪৬ জন দেখেছেন
আপডেট : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
oplus_1024

কোরবানির ঈদ পেরিয়ে গেছে। উৎসবের কোলাহল স্তিমিত হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু দিনাজপুরের রামনগর চামড়া মার্কেটে এখনো থামেনি অপেক্ষা। লবণের সাদা স্তূপের নিচে সংরক্ষিত হাজার হাজার চামড়া যেন নীরবে বহন করছে ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন, বিনিয়োগ আর অনিশ্চয়তার ভার।
দিনাজপুর চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির তথ্যমতে, এ বছর জেলার ৩৩ জন নিবন্ধিত ব্যবসায়ী মোট ২৩ হাজার ৫২০ পিস গরুর চামড়া সংরক্ষণ করেছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চামড়াগুলোকে পচন থেকে রক্ষা করতে শ্রমিকরা দুই দিন পরপর লবণ পরিবর্তন করছেন। প্রতিটি চামড়া আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে, যাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয়।
চামড়া শ্রমিক আব্দুল্লাহ বলেন, “আমরা প্রতি দুই দিন অন্তর লবণ পরিবর্তন করে দিই এবং প্রতিটি চামড়া খতিয়ে দেখি। কোথাও পচন ধরছে কি না, সেদিকে বিশেষ নজর রাখি।”
উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম চামড়া বিপণনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রামনগর এলাকায় সারি সারি লবণের স্তূপে সাজিয়ে রাখা হয়েছে চামড়াগুলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী এগুলো ঢাকার হেমায়েতপুর ট্যানারি পল্লীতে পাঠানোর কথা। কিন্তু সেই যাত্রার দিনক্ষণ এখনো অনিশ্চিত।
ব্যবসায়ী হায়দার আলী এ মৌসুমে প্রায় ৫ হাজার চামড়া সংরক্ষণ করেছেন। প্রতিটি চামড়ায় অন্তত ১০০ টাকা লাভের আশা থাকলেও এখন পর্যন্ত ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কোনো সুস্পষ্ট বার্তা না পাওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন।
একই অবস্থা ব্যবসায়ী মোকলেসুর রহমানের। তিনি প্রায় ১০ হাজার চামড়া সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, এবার লবণের দাম বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সংরক্ষণ ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু চামড়া বিক্রির বিষয়ে ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত না আসায় ব্যবসায়ীদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য আরও বড় একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, দিনাজপুর জেলার ১৩ উপজেলায় এ বছর মোট ২ লাখ ২২ হাজার ৮টি পশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে গরু ও বকনা ৩০ হাজার ১৬১টি, বলদ ও ষাঁড় ৭২ হাজার ৪১টি, মহিষ ৪৭টি, ছাগল ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৮৭টি এবং ভেড়া ৬ হাজার ২৭২টি।
সে হিসেবে চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যদের সংরক্ষিত ২৩ হাজার ৫২০টি চামড়া মোট কোরবানিকৃত পশুর মাত্র ১০ দশমিক ৫৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ। প্রশ্ন উঠেছে— বাকি ৮৯ শতাংশ চামড়া কোথায়?
দিনাজপুর চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির আহ্বায়ক আক্তার হোসেন বলেন, “আমাদের সদস্যরা ২৩ হাজার ৫২০ পিস চামড়া সংরক্ষণ করেছেন। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে সেগুলোকে নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা।”
তবে অবশিষ্ট বিপুল পরিমাণ চামড়ার অবস্থান সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সমিতির নেতা মোহাম্মদ আলী জানান, এ বছর তাদের সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ হাজার পিস। কিন্তু অনেক চামড়ায় লাম্পি স্কিন রোগের প্রভাব থাকায় কাঙ্ক্ষিত সংগ্রহ সম্ভব হয়নি। আক্রান্ত চামড়ার একটি অংশ কম মূল্যে বা কেজি দরে বিক্রি করতে হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
চামড়ার এই অমিলের পেছনে সীমান্তপথে পাচারের কোনো সম্ভাবনা রয়েছে কি না— এমন প্রশ্নও উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
বিজিবি সূত্র জানায়, ভারত থেকে অবৈধ ‘পুশ ইন’ ঠেকানোর পাশাপাশি কোরবানির মৌসুমে দেশের মূল্যবান চামড়া যেন কোনো অবস্থাতেই সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে পাচার হতে না পারে, সে লক্ষ্যে সীমান্তজুড়ে অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। বিজিবির ভাষ্য, বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে বিপুল পরিমাণ চামড়া সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে পাচার হওয়া প্রায় অসম্ভব।
সীমান্তবর্তী কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারাও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তাদের মতে, সীমান্তে এখন কঠোর নজরদারি চলছে। ফলে কোনো চামড়া বড় আকারে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে চলে যাওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।
দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক রিয়াজউদ্দিন বলেন, “চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণের জন্য সরকার বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে না পড়েন।”
তবে মোট কোরবানিকৃত পশুর তুলনায় বিপুল সংখ্যক চামড়ার হিসাব না মেলার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
সন্ধ্যা নেমে এলে রামনগরের চামড়া মার্কেটে লবণের স্তূপগুলো আরও নীরব হয়ে ওঠে। সেখানে জমে থাকা চামড়াগুলো যেন শুধু পশুর চামড়া নয়— সেগুলোতে লেগে আছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন, শ্রম আর পুঁজির গল্প। কিন্তু সেই গল্পের শেষ অধ্যায় এখনো লেখা হয়নি।
আজ দিনাজপুরের চামড়া বাজারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন মূল্য নিয়ে নয়, বিক্রি নিয়েও নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— কোরবানিকৃত পশুর বিপুল সংখ্যক চামড়ার মধ্যে দৃশ্যমান মাত্র ১১ শতাংশ, আর বাকি ৮৯ শতাংশের গল্প কোথায় হারিয়ে গেল?
সংখ্যার এই নীরব ফাঁকই এখন দিনাজপুরের চামড়া বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় রহস্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd