• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৯:৫৮ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

প্রশান্ত মহাসাগরের জল-ছন্দ

খাদেমুল ইসলাম, সাংবাদিক ও বিশ্লেষক / ৮ জন দেখেছেন
আপডেট : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

প্রকৃতি যেন এক নিভৃত শিল্পীর তুলি, যা প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশির গভীরে প্রতিদিন এক গোপন মহাকাব্য রচনা করে চলেছে। এই অসীম জলধির বুকে যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা তার স্বাভাবিক ছন্দ হারায়, তখন পৃথিবীতে শুরু হয় এক অদ্ভুত ওলটপালট। আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা ‘এল নিনো’ (El Niño) ও ‘লা নিনা’ (La Niña) নামে চিনি, তা আসলে প্রকৃতির এক চিরন্তন দোদুল্যমান অবস্থা—একদিকে দহন, অন্যদিকে প্লাবন।

অস্তিত্বের দ্বৈরথ: দহন ও প্লাবন
‘এল নিনো’—স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘ছোট বালক’—এক উষ্ণ জলবায়ুগত বিপর্যয়। যখন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সমুদ্রের উষ্ণ পানি পূর্ব উপকূলের দিকে ধেয়ে আসে। যেন এক ক্লান্ত অভিযাত্রী তীরে ফিরে আসে। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খরা, দাবদাহ ও কৃষি বিপর্যয় দেখা দেয়।
ঠিক বিপরীতমুখী ‘লা নিনা’ বা ‘ছোট বালিকা’। শক্তিশালী বাণিজ্য বায়ু উষ্ণ পানিকে পশ্চিমে ঠেলে দেয়, আর সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে আসে শীতল পুষ্টিসমৃদ্ধ জলধারা। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাড়ে অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী প্লাবন। প্রকৃতি তখন নতুন এক ভারসাম্য রচনা করে।

রহস্যের উন্মোচন: স্যার গিলবার্ট ওয়াকারের অবদান
এই জলবায়ু চক্রের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন Sir Gilbert Walker। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রিটিশ ভারতে কাজ করার সময় তিনি বুঝতে পারেন, পৃথিবীর এক প্রান্তের আবহাওয়া অন্য প্রান্তের সাথে অদৃশ্য সূতোর মতো সংযুক্ত।
ওয়াকারের যুগান্তকারী আবিষ্কার ছিল ‘সাউদার্ন অসিলেশন’ (Southern Oscillation)। তিনি দেখান, ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের বায়ুচাপের মধ্যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক রয়েছে। এটিই পরবর্তীতে ENSO চক্রের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। তাঁর গবেষণাই বিশ্বকে প্রথম জানিয়েছিল—প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাসের পরিবর্তন কীভাবে বাংলাদেশের কৃষি কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করে।

একটি অজানা সত্য: সাগরের ‘মেমোরি’
সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য হলো, প্রশান্ত মহাসাগর যেন এক ‘স্মৃতিধারী’ সত্তা। সমুদ্র তার গভীরে বছরের পর বছর তাপ সঞ্চয় করে রাখে এবং নির্দিষ্ট সময় পর তা মুক্ত করে। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং প্রকৃতির দীর্ঘমেয়াদী ছন্দ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে এই চক্র এখন আরও অস্থির ও অনিয়মিত হয়ে উঠছে, যা বিজ্ঞানীদের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

উপসংহার
এল নিনো ও লা নিনা শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়; এগুলো পৃথিবীর হৃদস্পন্দন। এদের ছন্দপতনে বদলে যায় কৃষকের মাঠ, নদীর স্রোত ও মানুষের ভবিষ্যৎ। আর স্যার গিলবার্ট ওয়াকারের শতবর্ষ পুরনো গবেষণা আজও মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবী বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এক সুতোয় বাঁধা জীবন্ত মহাব্যবস্থা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd