চোখে আলো নেই, তাতে কী? মনের আলো আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা এসএসসি-তে অংশ নিয়েছে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শরীফ আলী (১৯)। জন্ম থেকেই অন্ধত্বকে সঙ্গী করলেও পড়ালেখার প্রতি তীব্র আগ্রহ শরীফকে নিয়ে এসেছে পরীক্ষার বেঞ্চে।
ঠাকুরগাঁও শহরের গোবিন্দনগর মুন্সিরহাট মহল্লার ইজিবাইকচালক রমজান আলীর ছেলে শরীফ। অভাবের সংসার আর শারীরিক সীমাবদ্ধতা—কোনো কিছুই তার পথ আটকাতে পারেনি। পরিবারের সদস্যদের মুখে মুখে পড়া শুনেই তার শিক্ষার হাতেখড়ি। গোবিন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শেষ করে ২০২১ সালে সে ভর্তি হয় ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নেয় শরীফ। নিজে লিখতে না পারায় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন শ্রুতলেখকের সহায়তা নিচ্ছে সে। পরীক্ষা শুরুর আগে শরীফ জানায়, তার স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি করা, যাতে বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারে।
শরীফের এই যাত্রায় সহযোগী হিসেবে এগিয়ে এসেছে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার। শুরুতে শ্রুতলেখক না পাওয়ায় শরীফের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি গণমাধ্যমে জানাজানি হলে শায়লা স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে এবং দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অনুমতিক্রমে আজ সে শরীফের হয়ে উত্তরপত্রে কলম ধরছে। শায়লা জানায়, তার হাতের লেখায় যদি শরীফ ভালো ফল করতে পারে, তবেই তার পরিশ্রম সার্থক হবে।
কেন্দ্র সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শাহানুর বেগম চৌধুরী জানান, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থী হিসেবে শরীফকে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ঘণ্টায় অতিরিক্ত ১৫ মিনিট সময়সহ প্রয়োজনীয় সকল সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন আকতার জানান, এ বছর জেলায় ৩৯টি কেন্দ্রে মোট ২৩ হাজার ২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে শরীফের মতো অদম্য মেধাবীদের জন্য পরীক্ষা কেন্দ্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।
শরীফ আলীর এই লড়াই প্রমাণ করে, দৃঢ় সংকল্প থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না। জেলাজুড়ে শরীফের এই অদম্য পথচলা এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার উৎস।