• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪২ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনামঃ

শিশিরের বুক চিরে বৈশাখ: দিনাজপুরে রঙিন আত্মজাগরণের শোভাযাত্রা

খাদেমুল ইসলাম, দিনাজপুর / ১১৪ জন দেখেছেন
আপডেট : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

প্রকৃতিপুত্র জীবনানন্দ দাশ যেন আজও ভোরের কুয়াশায় দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলেন—
“চারিদিকে নুয়ে পড়েছে ফসল, তাদের স্তনের থেকে ফোটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল!”
সেই শিশিরবিন্দুতে লুকিয়ে থাকে নবজন্মের অমল স্বপ্ন—যেখানে প্রতিটি ফোঁটা এক একটি বৈশাখের সূচনা।
দিনাজপুরের প্রভাত আজ তাই শুধু একটি সকাল নয়—এ যেন সময়ের বুক চিরে ওঠা এক অনন্ত জাগরণ। আকাশে হালকা রোদ, বাতাসে কাঁচা ধানের গন্ধ, আর মানুষের চোখে নতুন দিনের দীপ্ত প্রত্যয়—সব মিলিয়ে শহরটি যেন হয়ে ওঠে এক জীবন্ত কবিতা।
কুলার বুকে গ্রামীণ জীবনের ছাপ, ঢেকির ছন্দে কৃষকের ঘাম, পেঁচার গভীর চোখে সময়ের নিঃশব্দ ইতিহাস—এই সব প্রতীক যেন শোভাযাত্রায় প্রাণ পায়। তরুণীদের বাসন্তী শাড়ি রোদে ঝলমল করে ওঠে, যেন সরষে ফুলের মাঠ হেঁটে এসেছে শহরে। তরুণদের পাঞ্জাবিতে লেগে থাকে আবিরের রঙ—যেন তারা নিজেরাই হয়ে উঠেছে বৈশাখের রঙিন দূত।
সকাল আটটায় দিনাজপুর একাডেমি স্কুল মাঠ থেকে শুরু হওয়া বৈশাখী শোভাযাত্রা ধীরে ধীরে রূপ নেয় মানুষের ঢেউয়ে। ঢাকের প্রতিটি আওয়াজ যেন হৃদস্পন্দনের মতো বাজে, আর সেই তালে তালে শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ—সবাই মিশে যায় এক অখণ্ড স্রোতে। শহরের পথঘাট পেরিয়ে শোভাযাত্রাটি যখন গড়ের শহীদ বড় মাঠে এসে থামে, তখন মনে হয়—এ যেন কোনো যাত্রার শেষ নয়, বরং এক অনন্ত যাপনের শুরু।
এই প্রাণময় শোভাযাত্রায় অংশ নেন সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম—দিনাজপুর সদর-৩ আসনের সংসদ সদস্য; এডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল—জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক; মোঃ রফিকুল ইসলাম—জেলা প্রশাসক; জেদান আল মুসা—পুলিশ সুপার; মোঃ রিয়াজ উদ্দিন—অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ডিডিএলজি; এবং আবু বক্কর সিদ্দিক—দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি।
তাদের উপস্থিতি যেন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে মানুষের উৎসবে মিশে যাওয়ার এক উজ্জ্বল প্রতীক—যেখানে পদবী মুছে যায়, থেকে যায় শুধু মানুষ আর তার উৎসব।
এরপর নান্দনিক রূপে সাজানো স্টেশন ক্লাবে বসে পান্তা উৎসব। পান্তা-ইলিশের গন্ধে, ভাটিয়ালির সুরে আর হাসির ঢেউয়ে সেখানে জেগে ওঠে গ্রামবাংলার আত্মা। শহরের বুকেই যেন ফিরে আসে মাটির টান, শেকড়ের টান।
পহেলা বৈশাখের এই দিনটি কেবল উৎসবের নয়—এটি ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস আর আশার মিলনবিন্দু। মোগল সম্রাট জলালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর-এর সময় কৃষকের জীবনের প্রয়োজনে যে বাংলা সনের সূচনা, তা আজ বাঙালির আত্মপরিচয়ের দীপশিখা।
১৯৬৭ সালে ছায়ানট-এর প্রভাতী গান থেকে শুরু করে বৈশাখী শোভাযাত্রার শিল্পিত বিস্তার—সবই এক সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার অংশ। ২০১৬ সালে ইউনেসকো-এর স্বীকৃতি যেন সেই অভিযাত্রাকে বিশ্বমানচিত্রে স্থায়ী করে দেয়।
দিনাজপুরের এই বৈশাখ তাই কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়—এটি হৃদয়ের দরজা খোলা। এখানে প্রতিটি রঙে লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা, প্রতিটি সুরে বাজে ঐক্যের গান, আর প্রতিটি মুখে ফুটে ওঠে এক অদম্য বিশ্বাস—
পুরনো সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে, নতুন আলোয় বাঁচার অঙ্গীকার।
বৈশাখ আসে, আবার চলে যায়—
কিন্তু রেখে যায় মানুষের ভেতরে এক অমলিন দীপ্তি,
যা কখনো মুছে যায় না…।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd