• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪২ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনামঃ

শিশিরভেজা বৈশাখে পান্তার গান

খাদেমুল ইসলাম, দিনাজপুর / ১১৮ জন দেখেছেন
আপডেট : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

শিশিরভেজা বৈশাখে পান্তার গান: দিনাজপুরে শেকড়ের উৎসব ও রাষ্ট্রচিন্তার আলো
প্রকৃতিপুত্র জীবনানন্দ দাশ যেন আজও ভোরের কুয়াশায় দাঁড়িয়ে বলেন—
“চারিদিকে নুয়ে পড়েছে ফসল, তাদের স্তনের থেকে ফোটা ফোটা পড়িতেছে শিশিরের জল!”
এই শিশিরভেজা প্রভাতেই বাঙালির নতুন বছরের সূচনা—বৈশাখের আগমনে জেগে ওঠে মাটি, মানুষ আর স্মৃতির অনন্ত স্রোত।
দিনাজপুর আজ বৈশাখের আলোয় ভেসে থাকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। ঢাকের শব্দে, আবিরের রঙে, মানুষের উচ্ছ্বাসে শহরটি যেন রূপ নেয় এক চলমান কবিতায়। শোভাযাত্রার পর শহরের আরেকটি নীরব কিন্তু গভীর পর্ব—পান্তা উৎসব—মানুষকে ফিরিয়ে আনে শেকড়ের কাছে।
স্টেশন ক্লাবের নান্দনিক প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই পান্তা উৎসবে অংশ নেন সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম—দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য; এডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল—জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি; জেদান আল মুসা—পুলিশ সুপার; মোঃ রিয়াজ উদ্দিন—অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও ডিডিএলজি; এবং আবু বক্কর সিদ্দিক—দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি।
তাদের উপস্থিতি এই উৎসবকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি থেকে বের করে এনে এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনের পরিসরে রূপ দেয়।
পান্তা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ আর ইলিশের ঘ্রাণে সেখানে ফিরে আসে গ্রামবাংলার সেই হারিয়ে যাওয়া উঠোন—যেখানে জীবন ছিল সহজ, কিন্তু সম্পর্ক ছিল গভীর।
বৈশাখ তাই শুধু নতুন বছর নয়; এটি শেকড়ে ফেরার ডাক, স্মৃতির পুনর্জাগরণ, আর আত্মপরিচয়ের উৎসব।
পান্তা উৎসবের ইতিহাস…..
পান্তা ভাতের উৎপত্তি বাংলার কৃষিজীবী সমাজে। গ্রীষ্মকালে শ্রমজীবী মানুষের সহজ, শীতল ও সাশ্রয়ী খাদ্য হিসেবে চাল পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ার প্রচলন থেকেই এর জন্ম। ধীরে ধীরে এটি দৈনন্দিন খাদ্য থেকে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশে পরিণত হয়। পরবর্তীতে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে এর সংযোজন ঘটে শেকড়ে ফেরা ও সরল জীবনের প্রতীক হিসেবে, বিশেষ করে শহুরে বৈশাখী আয়োজনে পান্তা-ইলিশ পরিবেশনের মাধ্যমে এটি উৎসবের মর্যাদা লাভ করে।
রাষ্ট্রচিন্তাবিদ চাণক্যের প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গি
রাষ্ট্রচিন্তাবিদ চাণক্য-এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনে জনগণের জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক ঐক্যকে রাষ্ট্রশক্তির ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। তাঁর বিখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তার সারমর্ম অনুযায়ী, “যে রাষ্ট্র তার সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতিকে অবহেলা করে, সে রাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।”
এই দৃষ্টিকোণ থেকে পান্তা উৎসব কেবল একটি খাদ্য-সংস্কৃতি নয়; এটি জনগণের জীবনধারার সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের সংযোগের প্রতীক। সহজ, সাশ্রয়ী ও সমষ্টিগত খাদ্যাভ্যাস যেমন সমাজে সমতা ও সংহতি তৈরি করে, তেমনি বৈশাখী পান্তা উৎসবও সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতার এক জীবন্ত উদাহরণ।
দিনাজপুরের এই বৈশাখ তাই কেবল উৎসব নয়—এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাষ্ট্রচিন্তা এবং মানুষের শেকড়ে ফেরার এক অনন্ত আহ্বান।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd