দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার ভারে নুয়ে পড়া দিনাজপুরের মাঠ-ঘাটে আবারও জীবনের স্রোত ফিরিয়ে আনতে এক নতুন উদ্যোগ নিয়ে আসছে সরকার। কৃষকের স্বপ্ন ও মাটির সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করতে আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুর সফরে আসছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া গ্রাম থেকেই শুরু হবে এই নতুন যাত্রা।
পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী এমপি জানান, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দিনাজপুর অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা দূর হবে এবং প্রায় ৬ হাজার বিঘা জমির ফসল সরাসরি উপকৃত হবে। এতে কয়েক লক্ষ কৃষক পরিবারের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং কৃষি উৎপাদনে আসবে নতুন গতি।
রবিবার সকালে মন্ত্রী দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া খাল এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং খাল খননের প্রস্তুতি কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দেশের কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
তিনি আরও স্মরণ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের উলসি–যদুনাথপুর বেতনা নদীর পুনঃখননের মাধ্যমে দেশে খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। তার শাসনামলে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছিল। সেই উদ্যোগের ফলেই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যায়। বর্তমান উদ্যোগও সেই ঐতিহাসিক ধারাকে নতুন করে প্রাণ দেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর দিনাজপুর সফর ও খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে ৮ মার্চ রবিবার বিকেলে দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী এমপি এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এমপি।
দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর-১ আসনের এমপি মনজুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনের এমপি সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, দিনাজপুর-৩ আসনের এমপি সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব একেএম সাহাবুদ্দিন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক মো. এনায়েতুল্লাহ, রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি, জেলা পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এসিল্যান্ড, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।
সভায় প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সফল করতে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং খাল খনন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
এ বিষয়ে দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক হোসেন জানান, কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া এলাকার এই খালটির দৈর্ঘ্য ১২.২ কিলোমিটার, যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর উদ্যোগে পুনঃখনন করা হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে দিনাজপুর সদর, কাহারোল ও বিরল উপজেলার কয়েক লক্ষ কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দীর্ঘদিন পানির নিচে ডুবে থাকত। সেই জলাবদ্ধতার ভারে আশপাশের বিস্তীর্ণ জমির ফসল নষ্ট হয়ে যেত, কৃষকের স্বপ্ন ভেসে যেত পানির স্রোতে। কিন্তু খালটি পুনঃখনন সম্পন্ন হলে সেই স্থবির জলধারা আবারও প্রাণ ফিরে পাবে—মাঠে ফিরবে সবুজের হাসি। তখন কৃষকের ঘামে ভেজা জমি থেকে উঠবে অতিরিক্ত কয়েক লক্ষ টাকার ধান, আর গ্রামীণ জনপদের বাতাসে ভেসে উঠবে নতুন আশার সুবাস।
অনেকে বলছেন, এই খাল পুনঃখনন কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এ যেন মাটির গভীরে চাপা পড়ে থাকা জীবনের স্রোতকে আবার জাগিয়ে তোলার এক প্রচেষ্টা। যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে দিনাজপুরের মাঠে আবারও দুলবে সোনালি ধানের শীষ, আর কৃষকের চোখে ফুটবে স্বস্তি আর স্বপ্নের দীপ্তি।।