
মাটির সঙ্গে মিশে থাকে কৃষকের জীবন। ঘামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার স্বপ্ন, আশ্বাস আর আগামী দিনের গল্প। কিন্তু সেই মাটিই আজ যেন ফিরিয়ে দিচ্ছে না ন্যায্য প্রতিদান। মৌসুমের শুরুতেই আলু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন দিনাজপুরের হাজারো চাষি। রোগবালাই একদিকে, অন্যদিকে বাজারে ধস—সব মিলিয়ে প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের আশু হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
দিনাজপুর শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা পূর্ণভবা নদী যেন আজ নীরব সাক্ষী কৃষকের দীর্ঘশ্বাসের। নদীর ধার ঘেঁষে সবুজের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা উলিপুর—‘সবজি গ্রাম’ নামে পরিচিত এই জনপদেই দিনাজপুর সদর উপজেলার সিংহভাগ সবজি চাষ হয়। সেই মাঠেই দাঁড়িয়ে ৭০ বছর ছুঁইছুঁই আব্দুল মজিদ মোল্লা। মৃত সমীর উদ্দিন মোল্লার এই ছেলে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মাটির সঙ্গে লড়াই করে।
এ মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন তিনি। সার, বীজ, কীটনাশক আর শ্রম—সবকিছুর দাম বেড়েছে লাগামছাড়া। দুই বিঘা জমিতে আলু আবাদ করতে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সেই খরচের বোঝা মাথায় নিয়েই আজ বস্তায় ভরছেন আলু। কিন্তু কপাল বেয়ে নামছে চিন্তার ঘাম। কারণ বাজারে আলুর দাম নেমে এসেছে কেজিপ্রতি মাত্র ১৫ থেকে ১৬ টাকায়। হিসাব মিলিয়ে দেখলে এক বিঘা জমিতেই লোকসান প্রায় ৩০ হাজার টাকা।
বেদনা ভেজা কণ্ঠে আব্দুল মজিদ বলেন, “পাইকাররা আলু নিতে চায় না। নিলেও টাকা দেয় এক সপ্তাহ পরে। আলু এখন গরু-ছাগলের খাবার হয়ে গেছে।”
কৃষকের ঘামে ফলানো ফসলের ওপর যেন এ এক তির্যক আঘাত। শুধু আব্দুল মজিদ নন, দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলার হাজারো কৃষকের হৃদয়ের ভাষা এখন একই রকম করুন। যে আকাশে থাকার কথা ছিল উৎসবের রোদ, সেই আকাশ-বাতাস আজ ভারী লোকসানের দীর্ঘশ্বাসে।

মাটির বুকে স্বপ্ন পুঁতে লোকসানের ফসল
জেলার বিরল উপজেলার ১০ নম্বর রানীপুকুর ইউনিয়নের মৃত আব্বাস উদ্দিনের ছেলে মো. মোশাররফ হোসেন জানান, গেল মৌসুমেই আলু উৎপাদনে তার লোকসান হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এ বছরও চিত্র একই। অব্যক্ত বেদনায় তিনি বলেন, “বারবার এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। চাষিদের এই বেদনার পাণ্ডুলিপি শোনার মতো যেন কেউ নেই।”
এ বিষয়ে বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার জানান, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে কার্ডিনাল, কারেজ ও সানশাইন জাতের আলু প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। উৎপাদন আশানুরূপ হলেও মৌসুমের শুরুতেই দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের আশায় আছেন তারা। ন্যায্য দাম নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আলু চাষে কৃষকের আগ্রহ কমে যাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মোহাম্মদ আনিছুজ্জামান জানান, জেলার ১৩টি উপজেলায় এবার ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন। এরই মধ্যে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির আলু কর্তন সম্পন্ন হয়েছে। তবে মৌসুমের শুরুতেই দাম নিম্নমুখী হওয়ায় কৃষকের মুখে নিরাশার ছাপ স্পষ্ট।
তিনি বলেন, আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগার সম্প্রসারণ ও বৈদেশিক বাজার তৈরির বিষয়ে কাজ চলছে। তবে এই সংকট মোকাবিলায় সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। “কৃষিকে বাঁচাতে হবে, বাঁচাতে হবে কৃষককে। তা না হলে কৃষির ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।”
উল্লেখ্য, আলু এখন কৃষকের নিত্যদিনের কান্নার নাম। পরিশ্রমে ফলানো এই নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত না হলে—এই উৎপাদন কি কৃষকের জন্য আশীর্বাদ হয়ে থাকবে, নাকি আরও এক দফা ঋণ আর হতাশার গল্প লিখবে—সেই প্রশ্নই আজ ঘুরছে দিনাজপুরের মাঠে মাঠে।