• শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৬ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

মধ্যপ্রাচ্য পাল্টা হানা ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: / ২১ জন দেখেছেন
আপডেট : সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬
সংগৃহীত ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানজুড়ে বিস্তৃত হামলা, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু, এরপর তেহরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তৃতীয় দিনে এসে আরও বিস্ফোরক। যুদ্ধ এখন আর শুধু ইরান-ইসরাইল সীমায় সীমাবদ্ধ নেই; কাতার, কুয়েত, লেবানন, সাইপ্রাস এমনকি উপসাগরীয় জ্বালানি স্থাপনাও এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির অংশ হয়ে উঠেছে। হতাহত বেড়েই চলেছে, তেলের দাম লাফিয়ে উঠছে, আর কূটনৈতিক দরজা কার্যত বন্ধ হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান।
বাড়ছে যুদ্ধের তীব্রতা : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। আকাশপথে যুদ্ধবিমান, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে দেশটির বিভিন্ন সামরিক, সরকারি ও কৌশলগত স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলা চলছে। পাল্টা হিসেবে ইরানও ইসরাইল অভিমুখে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
রয়টার্স ও বিবিসির লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতভর বিস্ফোরণ, সাইরেন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টের ঘটনায় উপসাগরীয় আকাশ উত্তপ্ত ছিল। দোহা, আবুধাবি, মানামা ও কুয়েত সিটিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার পর যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করতে দেখা গেছে।
সংঘাতের বিস্তার এখন বহুমাত্রিক। স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে। ওমান উপকূলে তেলবাহী জাহাজে ড্রোন বোট হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। লেবাননে ইসরাইলি বোমাবর্ষণ এবং হিজবুল্লাহর রকেট হামলা যুদ্ধকে আরেক ধাপে নিয়ে গেছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা যুদ্ধের ভয়াবহতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আক্রান্ত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা : ইরান পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বাগদাদের ইউএস ভিক্টোরিয়া ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার খবর জানিয়েছে ইরাকি টিভি চ্যানেলগুলো। একটি ড্রোন ঘাঁটির ভেতরে পড়ে, অন্যটি প্রতিহত করা হয়। কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনার আশপাশেও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের খবর এসেছে। কুয়েত সিটিতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে ধোঁয়া দেখা যায়। বাহরাইনজুড়ে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অন্তত তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ইরান-সমর্থিত হামলার জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখন সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে যুদ্ধের চরিত্র বদলে গিয়ে তা সরাসরি মার্কিন-ইরান সামরিক সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।
আক্রান্ত কাতার ও কুয়েতের তেলক্ষেত্র : সংঘাতের বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি খাতে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মেসাইদ এনার্জি প্লান্ট ও রাস লাফান শিল্প নগরীর একটি জ্বালানি স্থাপনায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। যদিও হতাহতের খবর নেই, ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন চলছে।
সৌদি আরবের রাস্তানুরা তেল শোধনাগারও ড্রোন হামলার পর সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। ধ্বংসাবশেষ পড়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক পর্যায়ে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় পতন হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
কুয়েতের ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ারে’ ভূপাতিত মার্কিন বিমান : কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুলবশত নিক্ষেপ করা গোলায় তিনটি মার্কিন এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে বলে সেন্টকম জানিয়েছে। ছয়জন ক্রু নিরাপদে বেরিয়ে আসেন।
সিএনএন ভিডিও বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, বিধ্বস্ত বিমানগুলো দ্বি-ইঞ্জিনবিশিষ্ট, যা এফ-১৫ই বা এফ/এ-১৮ মডেলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ ঘটনা যুদ্ধক্ষেত্রের বিশৃঙ্খলা ও ভুল সমন্বয়ের ঝুঁকি তুলে ধরেছে। মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ঘাটতি ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে আঘাত : তেহরান ও কারাজ শহরে টানা বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। নাতাঞ্জ পরমাণুকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ তুলেছেন জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো পরমাণু স্থাপনায় ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইসরাইলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাজিরজাদেহ নিহত হওয়ার পর নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নেতৃত্বে দ্রুত পরিবর্তন যুদ্ধের গভীরতা নির্দেশ করছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের ১৩১ শহর, নিহত অন্তত ৫৫৫ : আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, ১৩১টি শহর আক্রান্ত হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৫। এক লাখের বেশি সাড়া-দাতা সদস্য ও প্রায় ৪০ লাখ স্বেচ্ছাসেবক ত্রাণ কার্যক্রমে প্রস্তুত। মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে।
ইসরাইলে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। লেবাননে ইসরাইলি হামলায় নিহত ৩১। সংঘাতের মানবিক মূল্য ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।
ইসরাইলের নিশানায় লেবানন : হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট ও ড্রোন হামলা চালানোর পর ইসরাইল লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করেছে। বৈরুত ও দক্ষিণ লেবাননে অন্তত ৩১ জন নিহত, ১৪৯ জন আহত। আইডিএফ জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডার ও কমান্ড কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চলছে। ৫০টির বেশি গ্রামের বাসিন্দাদের সরে যেতে বলা হয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাঈম কাসেমকে ‘টার্গেট ফর এলিমিনেশন’ ঘোষণা করেছেন। এতে যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণুকেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া : নাতাঞ্জে হামলার অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আইএইএ প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, ক্ষতির প্রমাণ নেই, তবে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। জাতিসংঘে জরুরি বৈঠকের দাবি উঠেছে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। পরমাণু স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বড় কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
আলোচনায় নারাজ ইরান : সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলি লারিজানি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ চার সপ্তাহের মতো চলতে পারে এবং সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নিয়ে তার ‘ভালো তিনটি পছন্দ’ আছে। যুদ্ধ ও কূটনীতির এই দ্বৈত বার্তা অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। আপাতত সংঘাতের গতিপথ শান্তির চেয়ে আরও বিস্তৃত ও ভয়াবহ রূপের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সময়রে আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd