• মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০২ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনামঃ
খানসামায় বাংলা কিউআর কোড ব্যবহারে ক্যাশলেস ক্যাম্পেইন জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাস কাহারোলে সার বীজ ও কীটনাশক বিক্রেতা কল্যাণ সমিতির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত ফুলবাড়ীতে কাজিহাল ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১১ সদস্যের অনাস্থা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝড়ে পড়া শূন্যের কোটায় আনতে চাই-ববি হাজ্জাজ দিনাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক পরিবারের ফুলেল শুভেচ্ছা  স্বীকৃতিস্বরূপ সমিরন ঘোষকে ভলিবল ফেডারেশনের সম্মাননা প্রদান দিনাজপুরে মোটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে ১০১টি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জেলা বিএনপির প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত দিনাজপুরে লংকাবাংলা ফাউন্ডেশনের গাছের চারা রোপণ কর্মসূচি

ফুলবাড়ীতে কাজিহাল ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ১১ সদস্যের অনাস্থা

মো. রজব আলী, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিবেদক: / ৭ জন দেখেছেন
আপডেট : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব আদায় করা হয়েছে, কিন্তু সেই অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা পড়েনি। এমনকি পরিষদের ক্যাশ বইয়েও এর হিসাব নেই। হোল্ডিং ট্যাক্স ও রিকশা-ভ্যানের লাইসেন্স বাবদ ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ এবং চলতি ২০২৬ সালে আরও প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায়ের কথা জানিয়েছেন পরিষদের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, এসব অর্থের ব্যবস্থাপনা করেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. কাঞ্চন মিয়া। পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাব সদস্যদের জানানো হয়নি।
শুধু রাজস্ব আদায়ের অর্থ নয়, বন বিভাগের প্রায় ৭ লাখ টাকা ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে আত্মসাৎ, হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের সঙ্গে ভুয়া ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে অর্থ নেওয়া, পরিষদের সদস্যদের সম্মানী ভাতা আটকে রাখা এবং দাপ্তরিক নথি ও রেজুলেশন দেখতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ৩ নম্বর কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের সব ১১ জন নির্বাচিত সদস্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাঞ্চন মিয়ার বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়েছেন।
সোমবার (৩১ আগষ্ট) সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে,
গত ২৩ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ হাসানের কাছে তাঁরা লিখিত অভিযোগ দেন। একই দিন ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে সদস্য মো. খাজানুর ইসলামকে আহ্বায়ক করে একটি বিশেষ সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগগুলোর মধ্যে সরকারি অর্থের হিসাব না থাকা এবং রাজস্ব ব্যাংকে জমা না দেওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুতর বলে মনে করছেন পরিষদের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগের পর গত ১৩ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব পরিদর্শনে গিয়ে অসংগতি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ইউএনও। এ ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত সচিব আমিনুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হোল্ডিং ট্যাক্স এবং রিকশা-ভ্যানের লাইসেন্স বাবদ প্রায় ৯ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালে আরও প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় হয়েছে। সব মিলিয়ে এই দুই খাতে প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায়ের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এসব অর্থ পরিষদের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সদস্যদের। এমনকি অফিসের ক্যাশ বইয়েও জমা দেখানো হয়নি বলে তাঁরা দাবি করেছেন।
কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সচিব আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘হোল্ডিং ট্যাক্স ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাঁর নিজস্ব লোকজন দিয়ে আদায় করেছেন। তিনি অফিসের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি।’
এ বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—পরিষদের নামে আদায় করা অর্থ কার কাছে ছিল, কত টাকা আদায় হয়েছে এবং সেই অর্থ কোথায় রাখা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ আগস্ট ইউএনও আহমেদ হাসান কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব পরিদর্শন ও অডিট করতে যান। তখন পরিষদের হিসাবে বিভিন্ন ধরনের অসংগতি পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
বিশেষ করে হোল্ডিং ট্যাক্স থেকে আদায় করা রাজস্বের অর্থ ব্যাংকে জমা না দেওয়ার বিষয়টি নজরে আসে। অফিসের ক্যাশ বইয়েও সেই অর্থ জমা দেখানো হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারপ্রাপ্ত সচিব আমিনুল ইসলামকে শোকজ করা হয়।
তবে সচিবের বক্তব্যে নতুন একটি বিষয়ও সামনে এসেছে। তিনি জানান, গত ১ জুন অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার সময় আগের সচিব সাজ্জাদ হোসেন তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও হিসাবের ফাইল বুঝিয়ে দেননি।
সাবেক সচিব সাজ্জাদ হোসেন অবশ্য ফাইলপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দু-এক দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র বুঝিয়ে দেবেন।
এতে ইউনিয়ন পরিষদের আর্থিক হিসাব ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় নথিপত্র ঠিকভাবে বুঝে নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এদিকে ইউপি সদস্যদের অনাস্থা অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মিরপুর জলম্বরি এলাকায় বন বিভাগের অর্থে বাস্তবায়িত একটি প্রকল্প নিয়েও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
সদস্যদের দাবি, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বন বিভাগ থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। কিন্তু ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ওই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
সদস্যদের দেয়া অনাস্থা প্রস্তাবে শুধু অর্থনৈতিক অনিয়ম নয়, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আচরণ নিয়েও একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে।
সদস্যদের দাবি, পরিষদের সভায় তাঁদের উপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেছেন, তিনি কাউকে ভয় পান না এবং ইউপি সদস্যদের কোনো প্রয়োজন নেই। তিন-চারজন সদস্যকে নিয়েই তাঁর কাজ চলে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সদস্যরা আরও বলেন পরিষদের রেজুলেশন খাতা কিংবা দাপ্তরিক কাগজপত্র দেখতে গেলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়। পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখতেও তাঁদের নিরুৎসাহিত করা হয়। এ সময় তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদ একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তাঁদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়েছে।
ইউপি সদস্যরা বলেন তাঁদের সম্মানী ভাতা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে। বর্তমানে সদস্য ও সদস্যাদের প্রায় ১৬ মাসের ভাতা বকেয়া বলে তাঁরা দাবি করেছেন।
ভাতা চাইতে গেলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অসদাচরণ করেন এবং ভাতা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান—এমন অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
একই সঙ্গে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের সঙ্গে ভুয়া ফ্যামিলি কার্ড ব্যবহার করে ইউনিয়নের বাসিন্দাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

গত ২৩ আগস্ট ৩ নম্বর কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের ১১ জন নির্বাচিত সদস্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাঞ্চন মিয়ার বিরুদ্ধে লিখিতভাবে অনাস্থা জানান।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে তাঁদের প্রশ্ন ছিল। রাজস্ব আদায়, প্রকল্পের অর্থ, সদস্যদের ভাতা এবং পরিষদের নথিপত্র ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরোধ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁরা একযোগে অনাস্থা জানানোর সিদ্ধান্ত নেন।
এদিন অনুষ্ঠিত বিশেষ সভায় এসব অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত করে স্থানীয় সরকার আইন ও ইউনিয়ন পরিষদ-সংক্রান্ত বিধি অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

এদিকে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক প্রয়াত তোফায়েল হোসেন চৌধুরীর সমর্থনে আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মানিক রতনের অনুপস্থিতিতে কাঞ্চন মিয়া ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
তাঁদের দাবি, তোফায়েল হোসেন চৌধুরী জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর সমর্থন ও প্রভাবের কারণে কাঞ্চন দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর কাঞ্চন অন্যদের আর গুরুত্ব না দিয়ে স্বেচ্ছাচারিতা শুরু করেন।
অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. কাঞ্চন মিয়ার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব টাকার হিসাব আছে। সব বুঝে দেওয়া হবে।’
সরকারি রাজস্বের অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা হয়নি কেন—এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘মিটিংয়ে আছি, পরে কথা বলব।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাসান বলেন, কাজিহাল ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবের বিষয়ে ইতিমধ্যে ভারপ্রাপ্ত সচিবকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে সচিবকে শোকজ করা হয়েছে। বিধি মোতাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাঞ্চনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd