কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কিত লাখ লাখ নতুন নথি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রায় ৩০ লাখ পাতা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এসব নথিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম এসেছে শত শতবার। সব নথিপত্র প্রকাশে ট্রাম্প স্বাক্ষরিত আইনের সময়সীমা উত্তীর্ণ হওয়ার ছয় সপ্তাহ পরে এগুলো প্রকাশ করা হলো।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ বলেন, এসব নথি প্রকাশের মাধ্যমে দীর্ঘ ও বিস্তারিতভাবে নথি খুঁজে বের করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে আইন মেনে চলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। নথিগুলোর মধ্যে আছে এপস্টেইনের কারাগারের থাকাকালীন বিস্তারিত তথ্য। এছাড়া তার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদন এবং জেলে থাকার সময় মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। এপস্টেইনের সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের বিরুদ্ধে তদন্তের নথিও আছে। ম্যাক্সওয়েলকে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারে এপস্টেইনকে সহযোগিতা করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। প্রকাশিত নথিপত্রের মধ্যে এপস্টেইন ও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে আদান-প্রদান করা ই-মেইল রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টেইেনর বন্ধুত্ব ছিল। তবে তিনি বলেছেন, সেই বন্ধুত্ব বহু বছর আগেই চুকে গেছে এবং এপস্টেইেনর যৌন অপরাধ বিষয়েও কিছু জানতেন না বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।
প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে এফবিআই গত বছর তৈরি করেছিল এমন একটি তালিকা রয়েছে। এতে ন্যাশনাল থ্রেট অপারেশন সেন্টারের কলসেন্টারে কর দিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছিল, সেগুলো রাখা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকই কোনো যাচাই না করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা এবং এর পক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না। এই তালিকায় ট্রাম্প, এপস্টেইন এবং আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাম্প বরাবরই এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের কথা অস্বীকার করে আসছেন। এপস্টেইনের অপরাধের কোনো ভুক্তভোগীও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ করেননি। সর্বশেষ অভিযোগগুলো সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউস ও বিচার বিভাগ নতুন নথির সঙ্গে প্রকাশিত এক বিবৃতির একটি অংশের দিকে ইঙ্গিত করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত অভিযোগ রয়েছে। এগুলো ২০২০ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এফবিআইয়ের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই, এগুলো মিথ্যা। যদি এগুলোর সামান্য বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকত, তাহলে সেগুলো অনেক আগেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের এক মুখপাত্র সর্বশেষ প্রকাশিত এপস্টেইন নথিতে থাকা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন। বিল গেটস যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন- এমন তথ্যও সেখানে করা হয়েছে। তার মুখপাত্র এসব অভিযোগকে একেবারেই হাস্যকর এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে মন্তব্য করেছেন।
২০১৩ সালের ১৮ জুলাইয়ের দুটি মেইল এপস্টেইনের লেখা বলে মনে হয়, তবে সেগুলো আদৌ বিল গেটসকে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা পরিষ্কার নয়। ই-মেইল দুটিই এপস্টেইনের নিজস্ব মেইল ঠিকানা থেকে পাঠানো এবং সেই একই ঠিকানায় ফেরত এসেছে। বিল গেটসের সঙ্গে যুক্ত কোনো ই-মেইল ঠিকানা সেখানে দেখা যায়নি। ই-মেইল স্বাক্ষরবিহীন।
নতুন প্রকাশ করা নথিতে ব্রিটেনের এলিট ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উঠে এসেছে। এর মধ্যে এপস্টেইন ও ‘দ্যা ডিউক’ নামের একজনের মধ্যকার ই-মেইলও আছে। ধারণা করা হয়, তিনি হলেন এন্ড্রু মাউন্টব্যাটেন উইন্ডসর। ই-মেইলে ডিনারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যেখানে অনেক গোপনীয়তা থাকবে। আরেকটি মেইলে এপস্টেইন দ্য ডিউককে ২৬ বছর বয়সী এক রাশিয়ান নারীর সঙ্গে পরিচয় করানোর প্রস্তাব দিয়েছেন।
এসব ই-মেইল ২০১০ সালের আগস্টে আদান-প্রদান করা হয়, যা এপস্টেইন একজন নাবালিকাকে প্রলুব্ধ করার দোষ স্বীকারের দুই বছর পরের ঘটনা। এসব ই-মেইলে অপরাধের ইঙ্গিত নেই।
এপস্টেইন সম্পর্কিত সব নথি প্রকাশ শেষ হলো কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। টড ব্ল্যাঞ্চ বলেছেন, নথিগুলো প্রকাশের মাধ্যমে নথি খুঁজে যাচাই করার দীর্ঘ ও বিস্তারিত কাজ শেষ হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয়, বিচার বিভাগ তার কাজ শেষ করেছে। তবে ডেমোক্র্যাটরা এখনও দাবি করছেন, বিচার বিভাগ কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই সম্ভবত প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার নথি আটকে রেখেছে।
ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রোহ খানা রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস মেসির সঙ্গে মিলে এপস্টেইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে সতর্ক। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, তারা ৬ মিলিয়নের বেশি পাতা শনাক্ত করেছে, কিন্তু যাচাই ও কিছু অংশ কাটছাট করার পর প্রকাশ করা হয়েছে মাত্র প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাতা।-সংবাদ