উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জনপদে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। দুই দশক পর আগামী ১২ জানুয়ারি আবারও পরিচিত পদধ্বনিতে মুখর হবে দিনাজপুরের মাটি। শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে নিজ শৈশবের ভূমিতে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার কণ্ঠে ও দর্শনে বিভেদহীন এক ‘রংধনু জাতি’র স্বপ্ন। জেলার সীমান্তসংলগ্ন ১৩টি উপজেলাজুড়ে তাই এখন উৎসবমুখর প্রত্যাশা।
দিনাজপুর—যার পরতে পরতে মিশে আছে উত্তরের শৌর্য, সংগ্রাম আর আতিথেয়তা। ১৫৭ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এই জেলার ১৩টি উপজেলায় বইছে ভিন্ন এক আবেগের হাওয়া। কারণ একটাই—দীর্ঘ বিশ বছরের অপেক্ষার ইতি টেনে এই জনপদে ফিরছেন তারেক রহমান, যাকে অনেকেই দেখছেন আগামীর নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে।

গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রে এক নাম। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কণ্ঠে আবেগ স্পষ্ট।
একজন কর্মী বলেন, “অনেক বছর ধরে আমরা তাকে দেখিনি। তিনি আমাদের মাঝে আসছেন—এটা আমাদের জন্য ঈদের আনন্দের মতো।”
দিনাজপুরের সঙ্গে তারেক রহমানের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে ব্যক্তিগত। এখানকার ধুলোবালি, অলিগলি আর খোলা মাঠে ছড়িয়ে আছে তার কৈশোরের স্মৃতি—অবাধ বিচরণ, বন্ধুদের সঙ্গে নির্ভার সময় কাটানোর গল্প। সেই শৈশবসঙ্গীরাই আজ স্মৃতির দরজা খুলে ফিরে যাচ্ছেন অতীতে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি হাসানুজ্জামান উজ্জ্বল বলেন, “তার সঙ্গে কাটানো সময়গুলো আজও চোখে ভাসে। সেই সহজ-সরল দিনগুলোর কথা ভাবলে আজও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি।”
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের শোক এখনো হৃদয়ে গভীরভাবে ধারণ করে রেখেছেন তারেক রহমান। তবে সেই শোককেই তিনি রূপ দিতে চাইছেন শক্তি ও সংহতির বার্তায়। তার লক্ষ্য—ধর্ম, বর্ণ কিংবা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘রংধনু জাতি’ এবং ‘রংধনু বাংলাদেশ’ গড়া, যেখানে মানুষ পরিচিত হবে কেবল মানুষ হিসেবে।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বলেন, “তিনি পরিবারের সদস্যদের কবর জিয়ারত করবেন। আমাদের মূল বার্তা হবে জাতীয় ঐক্য। তিনি আমাদের শেখাতে আসছেন কীভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রংধনু জাতি গড়ে তোলা যায়।”
স্মৃতির ক্যালেন্ডার উল্টালে থেমে যায় ২০০৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। খানসামার আত্রাই নদীর ওপর জিয়া সেতুর উদ্বোধন—সেটিই ছিল দিনাজপুরে তারেক রহমানের সর্বশেষ সফর। এরপর কেটে গেছে বিশটি বসন্ত। সময়ের পরতে পরতে জমেছে নির্যাতন, দমন-পীড়ন আর চৈত্রের খরতাপের মতো কঠিন বাস্তবতা।
অবশেষে আগামী ১২ জানুয়ারি—তৃষ্ণার্ত মাঠে যেন এক পশলা শান্তির সুবাতাস। দিনাজপুরবাসীর কাছে এই সফর কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি দীর্ঘ বিরহের অবসান, নতুন আশার সূচনা। রোদে পোড়া মাঠে শান্তির বার্তা নিয়ে আসা এই প্রত্যাবর্তনই হয়তো আগামীর রাজনীতির মানচিত্রে টানবে নতুন রেখা—আরও মানবিক, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, রংধনু রঙে রাঙানো এক সম্ভাবনার বাংলাদেশ।
এদিকে তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে দিনাজপুর জেলা বিএনপির উদ্যোগে আজ ৯ ডিসেম্বর দিনাজপুর শিশু একাডেমি মিলনায়তনে এক জরুরি প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলালের সভাপতিত্বে এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কোচির সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দিনাজপুর-৬ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী প্রফেসর ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, তারেক রহমানের এই সফর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। তিনি দোয়া মাহফিলে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যেই দিনাজপুরে আসছেন। সুতরাং পুরো কর্মসূচির রূপ হতে হবে অত্যন্ত মার্জিত, শোভন ও শৃঙ্খলাপূর্ণ। কোনো অবস্থাতেই যেন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত না হয়, সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “তারেক রহমান সবাইকে নিয়ে ঐক্য গড়তে প্রস্তুত। তিনি বিভেদের রাজনীতি নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে দিনাজপুরে আসছেন।”