বাংলাদেশ শিল্পকলা পদকপ্রাপ্ত সর্বজন শ্রদ্ধেয় নাট্যজন কাজী বোরহান ছিলেন বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে এক উজ্জ্বল মাইলফলক,
একজন প্রজ্ঞাবান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন নাট্যজগতের এক বটবৃক্ষ, যার ছায়াতলে বেড়ে উঠেছে অসংখ্য নাট্যকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে সংস্কৃতি ও সৃজনশীল চর্চার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য।
নাট্যচর্চার গন্ডি পেরিয়ে দিনাজপুরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রেখে গেছেন। একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি যে মূল্যবোধ, আদর্শ ও মানবিক চেতনা লালন করতেন, তা আজও আমাদের জন্য অনুকরণীয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর সেই আদর্শ ও সাংস্কৃতিক দর্শনকে আমরা এখনও পুরোপুরি ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারিনি।
মঙ্গলবার (২৩ জুন ২০২৬) সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় দিনাজপুর নাট্য সমিতি আয়োজিত নাট্যজন কাজী বোরহান এর দ্বিতীয় প্রয়ান দিবস উপলক্ষ্যে স্মরণ সভার আলোচনায় বক্তাগণ এসব কথা বলেন।
শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন, এক মিনিটি নিরবতা শেষে দিনাজপুর নাট্য সমিতির সভাপতি চিত্ত ঘোষ এর সভাপতিত্বে স্মরণ সভার আলোচনা পর্ব শুরু হয়।
এসময় বক্তব্য রাখেন নাট্য সমিতির সহ-সভাপতি সহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রহমান রেজু, সিরাজুম মনিরা, নাট্য নির্দেশক সম্বিত সাহা সেতু, জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ জেলা শাখার সভাপতি মানস কুমার ভট্টাচার্য, উদীচী দিনাজপুর সংসদের সভাপতি অধ্যাপক জলিল আহমেদ, সাংস্কৃতিক কর্মী সুলতান কামাল উদ্দিন বাচ্চু, নাট্য সমিতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এ্যাড. আব্দুল লতিফ, সামসুল আলম, কাজী বোরহানের বড় মেয়ে কাজী বন্যা আহমেদ, নাট্য সমিতির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নূরুল মতিন সৈকত।

আলোচকগণ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বলেন, বাংলাদেশের নাট্যকলাকে নিয়ে কাজ করা এবং এর উন্নয়নে নিজের পুরো জীবনকে সমর্পিত করাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন কাজী বোরহান উদ্দীন। তিনি তার জীবনের পুরোটা সময় ব্যয় করেছেন এই শিল্পচর্চার পিছনে। বিনিময়ে পেয়েছেনও অসংখ্য মানুষের
ভালবাসা এবং অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। দেশবরেণ্য কাজী বোরহান একাধারে ছিলেন নাট্যাভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যসংগঠক।
তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক পরম আশ্রয়, এক বিশাল বটবৃক্ষ। তরুণপ্রজন্মকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনতে এবং সংস্কৃতি চর্চায় যুক্ত করতে তিনি বাতিঘরের মতো কাজ করেছেন। দিনাজপুরের মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর সংযোগ ছিল গভীর। একজন খাঁটি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি আজীবন যে মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শ লালন করেছেন, তা আজ আমরা কতটা ধারণ করতে পারছি সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বক্তারা আরও বলেন, কাজী বোরহানের মৃত্যুতে নাট্যজগত একজন অভিভাবককে হারিয়েছে। তবে তাঁর কর্ম, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ তাঁকে মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
স্মরণ সভায় কাজী বোরহানকে নিয়ে লেখা কবিতা পাঠ করেন নাট্যাধ্যক্ষ তরিকুল আলম, আবৃত্তি করেন সহ-সাধারণ সম্পাদক সেখ ছগির আহমেদ কমল।
রবীন্দ্র ও নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন মিনারা পারভীন এবং নজরুল ইসলাম। এরপর দিনাজপুর নাট্য সমিতির নাট্য নির্দেশক নয়ন বার্টেল এর চিত্রগ্রহন এবং সম্পাদনায় নির্মিত প্রামান্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর ‘নাট্যলোকের নক্ষত্র- কাজী বোরহান’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সঞ্চালনায় ছিলেন
সমিতির অনুষ্ঠান সম্পাদক হারুন উর রশিদ।
এর আগে দিনাজপুর নাট্য সমিতি গৃহে কাজী বোরহানের অস্থায়ী
প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করেন দিনাজপুর নাট্য সমিতি, কাজী
বোরহানের বড় কন্যা কাজী বন্যা আহমেদ, উদীচী দিনাজপুর জেলা সংসদ, নবরূপী, আমাদের থিয়েটার, জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ জেলা শাখা, ভৈরবীসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন এবং শিশু শিল্পী ও অভিভাবকগন।
উল্লেখ্য, দিনাজপুর নাট্য সমিতির নাট্যাধ্যক্ষ কাজী বোরহান উদ্দীন নাট্যকলায় সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ‘শিল্পকলা পদক-২০১৫’ পান। ২০১৬ সালের ৫ মে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে তার হাতে পদক তুলে দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বিখ্যাত নাট্যদল
’দিনাজপুর নাট্য সমিতি’র সদস্য হওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রথম কোনো
পেশাদারী নাট্যসংগঠনে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করেন ’নবরূপী’; তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়া তিনি খাজা নাজিমুদ্দিন মুসলিম হল ও পাবলিক লাইব্রেরীর কার্যকরী পরিষদের সদস্য, দিনাজপুর ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন।
এছাড়া তিনি আমৃত্যু দিনাজপুর নাট্য সমিতির নাট্যাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।