• শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫২ পূর্বাহ্ন
  • [gtranslate]
শিরোনামঃ
বর্জ্যের ভারে বিপর্যস্ত কারওয়ান বাজার, দূষণের ছায়ায় জনস্বাস্থ্য বিরল ও হরিপুরে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মদ উদ্ধার দিনাজপুরে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের বর্ণাঢ্য র‌্যালী অনুষ্ঠিত বিরামপুরে চাকরি মেলা, আবেদন চার লাখের বেশি  নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও যৌন উত্তেজক সিরাপ আটক করলো ২৯ বিজিবি পীরগঞ্জে ১০০০ পিস ভারতীয় নেশাজাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধার বিএনপি মুখে যা বলে কাজ দিয়ে তা প্রমাণ করে-দিনাজপুরে ডা. জাহিদ দিনাজপুরে কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ ও সোনালী ব্যাংক পিএলসি’র সাথে চুক্তি স্বাক্ষর দীপশিখার উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু শিবির অনুষ্ঠিত দিনাজপুরে ডিজিটাল নম্বর প্লেট পুনঃ বিতরণ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন

বর্জ্যের ভারে বিপর্যস্ত কারওয়ান বাজার, দূষণের ছায়ায় জনস্বাস্থ্য

খুশনুদ কারিনা, বিশেষ প্রতিবেদক / ২১ জন দেখেছেন
আপডেট : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

রাজধানীর বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রে পরিবেশ সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও উত্তরণের পথ

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লার স্তূপ, পচা বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও অপরিচ্ছন্ন চলাচলের পথ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। বাজারের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য জমে থাকায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। মাছের উচ্ছিষ্ট, পচা সবজি ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য যথাসময়ে অপসারণ না হলে দুর্গন্ধ, নোংরা পানি ও জীবাণু বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ে। এই পরিস্থিতি শুধু পরিচ্ছন্নতার সংকট নয়; এটি নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বাজার থেকে প্রতিদিন কী পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং তা ঢাকার বায়ু ও পানিদূষণে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নির্ধারণে সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পরিমাপ প্রয়োজন। এ বিষয়ে কারওয়ান বাজারের বর্তমান দূষণের মাত্রা নির্ধারণকারী পূর্ণাঙ্গ গবেষণা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে বাজারটির বর্জ্য নিয়ে পুরোনো প্রতিবেদন, ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত গবেষণা এবং কারওয়ান বাজারের নগর রূপান্তর নিয়ে প্রকাশিত একাডেমিক গবেষণা সমস্যাটি বোঝার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দেয়।

বর্জ্যের স্তূপে পরিবেশের বিপন্নতা:
কারওয়ান বাজারে সবজি, মাছ, ফলসহ বিভিন্ন পণ্যের পাইকারি বেচাকেনা হয়। এসব কার্যক্রমে পচনশীল বর্জ্য, মাছের উচ্ছিষ্ট, পলিথিন, কার্টন ও অন্যান্য পরিত্যক্ত সামগ্রী তৈরি হয়। বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে জমা না করে খোলা জায়গায় ফেলে রাখলে দুর্গন্ধ ছড়ায়, মাছি ও ইঁদুরের আনাগোনা বাড়তে পারে এবং খাদ্যপণ্যের পরিচ্ছন্নতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

জৈব বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী গ্যাস তৈরি করতে পারে। অক্সিজেনের অভাবে পচন ঘটলে মিথেনও উৎপন্ন হতে পারে। অন্যদিকে, শুকনো বর্জ্য ও ধুলাবালি এবং যানবাহনের নির্গমন স্থানীয় বায়ুর মান খারাপ করতে পারে। বর্জ্য মিশ্রিত পানি নালায় প্রবেশ করলে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হতে পারে এবং দূষিত পানি আশপাশের জলাশয়ে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে। তবে এসব দূষকের মাত্রা ও বাজারের বায়ুদূষণে নির্দিষ্ট অবদান জানতে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার বিকল্প নেই।


২০০৯ সালে দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কারওয়ান বাজারের সবজি বাজার থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৫ টন বর্জ্য তৈরি হতো। এর মধ্যে একটি কম্পোস্ট কারখানায় দৈনিক প্রায় ১০ টন জৈব বর্জ্য নিয়ে সার তৈরির কার্যক্রম চলছিল।

এগুলো ২০০৯ সালের প্রতিবেদনভিত্তিক পরিসংখ্যান—বর্তমান বর্জ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ নয়। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, বাজারের জৈব বর্জ্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর উদ্যোগ আগে থেকেই ছিল। “সূত্র: The Daily Star, ২০০৯”

২০১৫: ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিআইজিডির গবেষণা:
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (BIGD) State of Cities 2015: Solid Waste Management of Dhaka City—Towards Decentralized Governance গবেষণায় বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, চূড়ান্ত অপসারণ, পুনর্ব্যবহার ও কম্পোস্ট তৈরির ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় ঢাকা শহরে দৈনিক বর্জ্য সংগ্রহের গড় হার ৭৬ শতাংশ এবং মাথাপিছু বর্জ্য উৎপাদনের হিসাব ০.৩৮ কেজি উল্লেখ করা হয়। এসব পরিসংখ্যান ঢাকা শহরভিত্তিক; কারওয়ান বাজারের বর্তমান বর্জ্য উৎপাদন বা সংগ্রহের হার নয়। গবেষণাটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়, সেবার ঘাটতি কমানো এবং জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের গুরুত্ব তুলে ধরে। “সূত্র: BIGD, State of Cities 2015”

২০১৫: কারওয়ান বাজারের নগর রূপান্তর নিয়ে গবেষণা:
Alexandra Eisenberger ও Markus Keck-এর The Blight in the Center: Dhaka’s Kawran Bazar in the Context of Modern Space Production শীর্ষক গবেষণাটি ASIEN সাময়িকীর ১৩৪তম সংখ্যায় ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়। এতে কারওয়ান বাজারকে কেন্দ্র করে নগর উন্নয়ন, বাজার স্থানান্তর ও বিকেন্দ্রীকরণের পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি সরাসরি বায়ু বা পানিদূষণ পরিমাপের গবেষণা নয়; তবে বাজারের ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনার প্রেক্ষাপট বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ।

২০২২ সালের ২৭ জুলাই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে হাতিরঝিলের পানিতে পয়োবর্জ্যের সঙ্গে কারওয়ান বাজারের মাছের বাজারের বর্জ্যপানি মিশে দুর্গন্ধ ছড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এটি গবেষণাপত্র নয়, বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যসহ প্রকাশিত সংবাদ। তবে এতে বাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রভাব বাজারের সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের জলাশয়েও পড়তে পারে—এমন উদ্বেগ স্পষ্ট হয়। “সূত্র: bdnews24.com, ২৭ জুলাই ২০২২

২০২৪: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা:
International Conference on Civil Engineering for Sustainable Development (ICCESD 2024)-এ প্রকাশিত Sustainable Practices of Solid Waste Management of Dhaka North City Corporation শীর্ষক প্রবন্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টেকসই চর্চা পর্যালোচনা করা হয়। এতে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, আদাবর, মোহাম্মদপুর ও বসিলাসহ কয়েকটি এলাকার মানুষের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার ও অপসারণ সম্পর্কে জ্ঞান নিয়ে জরিপের তথ্য রয়েছে। তবে এটি কারওয়ান বাজারের বর্জ্যের পরিমাণ, দুর্গন্ধ কিংবা বায়ু ও পানিদূষণের সরাসরি পরিমাপ নয়।

দূষণ রোধে চাই কার্যকর উদ্যোগ:
কারওয়ান বাজারের পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় প্রথমেই নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, চলাচলের পথ পরিষ্কার রাখা এবং নালা সচল রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মাছ ও সবজির পচনশীল বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাগজ ও কার্টন আলাদা করে সংগ্রহ করা গেলে পুনর্ব্যবহার এবং জৈব সার তৈরির সুযোগ বাড়বে। বর্জ্যপানি যাতে অপরিশোধিত অবস্থায় নালা ও জলাশয়ে না যায়, সে ব্যবস্থাও জরুরি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ এবং পরিবেশবিষয়ক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে বাজারের জন্য একটি স্থানভিত্তিক পরিবেশ সমীক্ষা পরিচালনা করা প্রয়োজন। এতে প্রতিদিনের বর্জ্যের ওজন ও ধরন, বর্জ্য সংগ্রহের হার, বায়ুর সূক্ষ্ম কণার মাত্রা, দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী গ্যাস এবং নালার পানির গুণগত মান পরীক্ষা করা যেতে পারে। পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হলে সমস্যার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ ও সমাধানের অগ্রগতি যাচাই করা সহজ হবে।
উপসংহার:
কারওয়ান বাজারের অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালে যেন পরিবেশের বিপন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি চাপা না পড়ে। অতীতের বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির উদ্যোগ, ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা এবং হাতিরঝিলের দূষণসংক্রান্ত প্রতিবেদন—সবই ইঙ্গিত দেয়, বর্জ্যকে অবহেলা করলে তার প্রভাব বাজারের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বর্তমান দূষণের মাত্রা নির্ধারণে বাজারকেন্দ্রিক বৈজ্ঞানিক তথ্য এখনও অপরিহার্য।
পরিকল্পিত বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কার্যকর পানি নিষ্কাশন এবং নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কারওয়ান বাজারকে পরিচ্ছন্ন ও জনস্বাস্থ্যসম্মত করা সম্ভব। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ, ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিবেদক: খুশনুদ কারিনা
শিক্ষার্থী,ডিপার্টমেন্ট অব জিওলজি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স
ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd