ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির স্মৃতিকে ধরে রেখে মানবতা ও ন্যায়বিচারের বার্তা ছড়িয়ে দিতে দিনাজপুর লেখক ফোরামের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো আলোচনা সভা ও কবিতা পাঠের আসর।
২৪ আগস্ট রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দিনাজপুর প্রেসক্লাব চত্বরে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন দিনাজপুর লেখক ফোরাম সভাপতি আজহারুল আজাদ জুয়েল।
ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অদিতি রায়ের সঞ্চালনায় আলোচনা করেন বিশিষ্ট কবি প্রফেসর জলিল আহমেদ, দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগীয় প্রধান, কবি ও গবেষক আলী ছায়েদ, দিনাজপুর প্রেসক্লাব সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চু, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী দুলাল, ইসলামিয়া মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী মিয়া, দিনাজপুর লেখক ফোরামের সহ-সভাপতি কবি বাসব রায়, কোষাধ্যক্ষ মাসুদা খাতুন, আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট রাবেয়া খাতুন রানু, প্রচার সম্পাদক মামুনুর রহমান জুয়েল প্রমুখ।
প্রফেসর জলিল আহমেদ বলেন, ইয়াসমিন শুধুমাত্র একটি মেয়ের নাম নয়, ইয়াসমিন হল নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ ইয়াসমিনকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল মানুষের, তা দিনাজপুর কিংবা বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বকেই নাড়িয়ে দিয়েছিল।
আলী ছায়েদ বলেন, আজকের এই প্রোগ্রাম হওয়ার কথা ছিল সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে। কিন্তু আজকে লেখকদেরকে এই আয়োজন করতে হচ্ছে এটা দুঃখজনক। আমরা চাই এমন একটি পরিবেশ গড়ে উঠুক, যেন এই দিবস আর কখনো পালন করতে না হয়, নারীর বিরুদ্ধে কখনো নির্যাতন না হয়। আমরা যেন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী থাকি এবং যাদের দায়িত্ব রয়েছে নারীর বিরুদ্ধে যে কোন সহিংসতা প্রতিরোধের, তারা যেন দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করেন।
তিনি আরো বলেন, শিশু দর্শন এখন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। পাঁচ বছর সাত বছর শিশুরা রেহাই পাচ্ছে না। আমাদের মন মগজে পচন ধরেছে বলেই এরকম একটি অবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দ্রুতই এরকম অবস্থার অবসান হবে।
দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চু বলেন, ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি শুধু একটি ঘটনা নয়, এটি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়া একটি ক্ষত। সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতা ও অবিচার বন্ধে আমাদের সবাইকে একসাথে সোচ্চার হতে হবে। লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা কলমের মাধ্যমে সেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন। আজকের এই আলোচনা ও কবিতা পাঠ সেই চেতনারই অংশ।
তিনি আরও বলেন, স্মরণ মানে শুধু শোক নয়, স্মরণ মানে ভবিষ্যতের জন্য অঙ্গীকার করা। নতুন প্রজন্ম যেন এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি না দেখে, সে জন্য শিক্ষা, সচেতনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। নারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এই দিনটি সকলের বিবেককে নাড়া দিবে এটাই আশা রাখি।
গোলাম রাব্বানী মিয়া বলেন, যারা রাষ্ট্রের ও সমাজের নিরাপত্তা বিধান করবে তাদের দ্বারাই সেদিন কিশোরী ইয়াসমিন নির্মম হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। যে কারণে মানুষ ফুঁসে উঠেছিল। আমরা চাই রাষ্ট্র যেন ইয়াসমিনদের মতো সকল নারীর নিরাপত্তা বিধান করতে সমর্থ হয়।
বাসব রায় বলেন, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ইয়াসমিন আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এখন নারী নির্যাতন অনেক বেড়ে গেছে। রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে এগিয়ে আসার।
মাসুদা খাতুন বলেন, নারী কোন বস্তু নয়, নারী অকৃত্রিম ভালোবাসার বন্ধন। নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে হবে সবাইকে। যতক্ষণ সমাজ ইয়াসমিননদের পাশে এসে না দাঁড়াবে ততক্ষণ নারী নির্যাতনের আর্তনাদ চলবেই। তাই নারীর পাশে সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
অ্যাডভোকেট রাবেয়া খাতুন রানু বলেন, যেখানেই নারী নির্যাতন সেখানে যেন প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায় সেই রকম সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
দিনাজপুর লেখক ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ছিল কবিতা পাঠ। স্থানীয় কবি ও আবৃত্তিকাররা ইয়াসমিনসহ সমাজে নির্যাতনের শিকার সকল নারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা পাঠ করেন। কবিতার মাধ্যমে উঠে আসে প্রতিবাদ, প্রত্যাশা ও মানবিক মূল্যবোধের কথা।
অনুষ্ঠানে নারী নির্যাতন বিরোধী স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন, ইয়াসমিন আরা রানু, কবি তুষার শুভ্র বসাক, কবি তহমিনা খাতুন, কবি কাউকাবুন্নেছা, কবি মোছাম্মৎ সোমা, কবি ওয়াসিম আহমেদ শান্ত প্রমুখ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আলোকিত দিনাজপুর সম্পাদক সুব্রত মজুমদার ডলার, কবি বিলকিস জান্নাত, কবি নুরে আলম সিদ্দিকী প্রমুখ। অনুষ্ঠানে ইয়াসমিন ও রংপুর জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক সহ একই পরিবারের চারজন এবং বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় নিহত নারীদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।