মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে স্পেন। ইরান যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দেশটি। অন্যদিকে, জেরুজালেমে এক জ্যেষ্ঠ ক্যাথলিক ধর্মযাজককে প্রার্থনা করতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ইসরায়েলি দূতকে তলব করেছে মাদ্রিদ। সোমবার স্পেনের সরকারি কর্মকর্তারা এই দুই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন।
স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মার্গারিটা রোবলস সোমবার সাংবাদিকদের জানান, ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অভিযানের জন্য স্পেনের আকাশসীমা বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। স্প্যানিশ সংবাদপত্র ‘এল পাইস’-এর বরাত দিয়ে জানা যায়, এই নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো তৃতীয় দেশে অবস্থানরত মার্কিন বিমানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এর আগে আন্তর্জাতিক আইনি সমর্থন ছাড়া স্পেন কোনো সামরিক পদক্ষেপে সমর্থন দেবে না বলে স্পষ্ট করার পর, দক্ষিণ স্পেনের ঘাঁটিতে বি-৫২ এবং বি-১-এর মতো কৌশলগত বোমারু বিমান মোতায়েনের প্রস্তাব বাতিল করে ওয়াশিংটন। তবে জরুরি পরিস্থিতিতে বিমান অবতরণ বা চলাচলের জন্য স্পেন সীমিত ছাড় দিয়েছে।
এ বিষয়ে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস জানান, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এমন কোনো কাজ না করার সরকারি নীতির সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যেকোনো মুহূর্তে আমরা ইরান থেকে ইউরোপের দিকে অভিবাসীদের ঢল দেখতে পারি।’ সংঘাতটি একটি চিরস্থায়ী যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এদিকে, ইরান যুদ্ধে সহযোগিতা না করলে স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে স্পেনের অর্থমন্ত্রী কার্লোস কুয়ের্পো রেডিও নেটওয়ার্ক ‘কাদেনা সের’-কে জানান, আকাশসীমা সংক্রান্ত এই সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তিনি বলেন, ‘সংঘাতের আগের মতোই আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঠিক আছে।’ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী কোনো একতরফা যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, জেরুজালেমের চার্চ অফ দ্য হোলি সেপালকারে পাম সানডের প্রার্থনায় কার্ডিনাল পিয়েরবাতিস্তা পিজাবাল্লাকে বাধা দেয় ইসরায়েলি পুলিশ। এই ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার স্পেনে নিযুক্ত ইসরায়েলের চার্জ ডি অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে মাদ্রিদ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ২০২৪ সালে ইসরায়েল তাদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিলে চার্জ ডি অ্যাফেয়ার্সই বর্তমানে স্পেনে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রতিনিধি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলবারেস স্প্যানিশ সম্প্রচারমাধ্যম ‘আরএসি১’-কে জানান, মাদ্রিদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এমন ঘটনা আর ঘটতে দেওয়া যায় না। ঐতিহাসিকভাবে যেভাবে হয়ে আসছে, ক্যাথলিকদের প্রার্থনা সেভাবেই স্বাভাবিকভাবে হতে দিতে হবে।’ তিনি আরও জানান, শুধু খ্রিষ্টান নয়, মুসলিমদেরও পবিত্র স্থানগুলোতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।
পাম সানডের দিনে লাতিন প্যাট্রিয়ার্ককে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা শত শত বছরের মধ্যে এই প্রথম বলে জানিয়েছে ক্যাথলিক কর্তৃপক্ষ। প্রথমে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন, ইরানের হামলার আশঙ্কায় প্যাট্রিয়ার্কের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের সমালোচনার মুখে নেতানিয়াহু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। রোববার গভীর রাতে তিনি প্যাট্রিয়ার্ককে গির্জায় প্রবেশের পূর্ণ অনুমতি দেওয়ার নির্দেশ দেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এই বাধাদানের ঘটনাকে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক আক্রমণ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।