• শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৫:২১ অপরাহ্ন
  • [gtranslate]

প্রসঙ্গ: দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান

ফেসবুক ডেস্ক / ৪৯ জন দেখেছেন
আপডেট : শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬
শামীম আল রাজী কর্তৃক ফেসবুকে পোস্টকৃত থেকে সংগৃহীত

দিনাজপুর গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান-
ইতিহাস, স্বত্ব ও জনসাধারণের অধিকারের এক মূর্ত প্রতীক:
কিছু মৌলিক প্রশ্ন:
যে মাঠে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেই ১৯৮৯ সালে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানে ৩৫ বছর পর দখলের যুক্তি কোথায়?
মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত যদি থাকে ‘যেমন আছে তেমন রাখা’, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের বিপরীতে যাওয়ার অধিকার কে রাখে?
বাংলাদেশের তামাদি আইন, ১৯০৮ (Limitation Act, 1908) অনুযায়ী, কোনো সরকারি জমি বা সম্পত্তির ক্ষেত্রে সাধারণত ৬০ (ষাট) বছর একটানা বেদখলে থাকলে সরকার তার মালিকানা বা অধিকার হারায়। এই সুদীর্ঘ সময় ধরে সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যদি বেদখলকৃত জমি উদ্ধার না করে, তবেই দখলদার আইনি সুবিধা পেতে পারেন। তার উপর এটি যদি সর্বসাধারণের ব্যবহার্য হয় তাহলে তো অধিকার আরো পাকাপোক্ত হয়।
যে জমিতে কখনো কোনো সামরিক স্থাপনা নির্মিত হয়নি, সেই জমির সামরিক দাবির ভিত্তি কী?
ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন জনপদ দিনাজপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান — যা স্থানীয়ভাবে ‘বড় মাঠ’ নামে পরিচিত। এটি একটি জীবন্ত সভ্যতার দলিল। দিনাজপুর শহরের জন্মলগ্ন থেকে এই মাঠ মানুষের হাসি-কান্না, উৎসব-শোক, সংগ্রাম ও আনন্দের সাক্ষী। প্রতিটি প্রজন্মের শিশু এখানে দৌড়েছে, তরুণ খেলেছে, প্রবীণ বিশুদ্ধ বাতাস গ্রহণ করেছে। তাই ‘লিভার অব দিনাজপুর’ খেতাবটি নিছক কাব্যিক উপাধি নয়, এটি লক্ষ মানুষের আবেগ ও অস্তিত্বের সত্যিকারের প্রতিফলন।
এই মাঠের স্বত্ব ও ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে একটি সত্য বারবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে — এই মাঠ সর্বদাই ছিল, আছে এবং থাকবে দিনাজপুরবাসীর। ভূমি রেকর্ডের জটিলতা যাই হোক, মাঠের সত্যিকার ইতিহাস মানুষের পায়ের ছাপে লেখা।
শহরের জন্মলগ্ন থেকে মাঠের অস্তিত্ব
দিনাজপুর শহর ১৭৮৭ সালে ঘোড়াঘাট থেকে বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। তারপর থেকেই শহর পরিকল্পনায় এই মাঠের অস্তিত্ব অনিবার্যভাবে ছিল। দিনাজপুর মহারাজার জমিদারির মধ্যে অবস্থিত এই মাঠটি ব্রিটিশ সরকার তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছিল বটে, কিন্তু কখনো একচেটিয়া সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেয়নি।
ব্রিটিশ আমলে মাঠের সর্বউত্তরে নির্মিত হয়েছিল খাদ্য গুদাম যা অবিভক্ত দিনাজপুরের একমাত্র সরকারি খাদ্য সংরক্ষণাগার ছিল। এই গুদামগুলো ছিল বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে। পাশাপাশি উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে ইউরোপিয়ান কর্মকর্তাদের জন্য স্টেশন ক্লাব গড়ে ওঠে, যা আজও একটি ঐতিহ্যবাহী বেসামরিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যমান।
মাঠের দক্ষিণাংশ ঘেঁষে ১৮৫১ সালে শহরের জলনিষ্কাশনের জন্য নির্মিত হয় স্কটস ক্যানেল। এই খালটি পশ্চিম দিকে কাঞ্চন নদীর সঙ্গে যুক্ত। এই কাজটি সম্পূর্ণ নাগরিক উদ্দেশ্যে।
পরবর্তীতে রেলস্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে বড় মাঠটি শহরের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই বিচ্ছিন্নতা মাঠকে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ভূমি রেকর্ডের আলোকে স্বত্বের বিশ্লেষণ
সি.এস. (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে) জরিপ দিনাজপুরে সম্পন্ন হয় ১৯৩৪ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগের সময়। সেই জরিপে মৌজা-প্রাণনাথপুর (জে.এল. নং-৬৩)-এর অন্তর্গত ৭৪.২১ একর জমি ‘ভারত সম্রাটের পক্ষে মিলিটারি ডিপার্টমেন্ট, পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক রক্ষিত’ হিসেবে খতিয়ানভুক্ত হয়। মৌজা-খামার ঝাড়বাড়ীর (জে.এল. নং-১০৭) অতিরিক্ত ৪.০৬ একরসহ মোট ৭৮.২৭ একর। তবে এই রেকর্ডটি বিশ্লেষণ করতে হবে তৎকালীন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে:
প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে উন্মুক্ত স্থান ও মাঠগুলো প্রায়শই ‘মিলিটারি রিজার্ভ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতো — মূলত যুদ্ধকালীন প্রয়োজনে সম্ভাব্য ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে। এই চিহ্নিতকরণ মানেই স্থায়ী সামরিক দখল নয়।
দ্বিতীয়ত, উল্লিখিত খতিয়ানে জমির শ্রেণী হিসেবে লেখা আছে ‘ডাংগা’ (অর্থাৎ উচ্চ অনুর্বর জমি বা খোলা মাঠ) কোনো ব্যারাক, সামরিক স্থাপনা বা সুনির্দিষ্ট সামরিক কাঠামোর উল্লেখ নেই।
তৃতীয়ত, একই সময়ে মাঠটির একাংশে স্টেশন ক্লাবের কার্যক্রম (১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত) চলমান ছিল, যা নিঃসন্দেহে বেসামরিক।
চতুর্থত, সি.এস. রেকর্ডেই বলা হয়েছে ‘রক্ষিত’ ‘দখলকৃত’ বা ‘ব্যবহৃত’ নয়। দুটির মধ্যে আইনগত পার্থক্য সুস্পষ্ট।
এস.এ. রেকর্ড: কাগজে পরিবর্তন, মাঠে স্থবিরতা
১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের আওতায় এস.এ. (স্টেট অ্যাকুইজিশন) জরিপে মালিকানা ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ পক্ষে মিলিটারি ডিপার্টমেন্ট’-এর নামে লেখা হয়। কিন্তু এই জরিপটি মাঠের বাস্তব অবস্থা পরীক্ষা করে করা হয়নি বরং সি.এস. রেকর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছিল।
উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে এই মাঠেই ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতে শুরু হয় কোনো স্থায়ী অবকাঠামো ছাড়াই। মাঠটি যদি সত্যিকারের সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকত, তাহলে এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন সম্ভব হতো না।
আর.এস. রেকর্ড: বাস্তবতার স্বীকৃতি
আর.এস. (রিভিশনাল সার্ভে) জরিপে মাঠটির স্বত্বের একটি বাস্তবসম্মত বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
প্রতিষ্ঠান জমির পরিমাণ ব্যবহারের ধরন
বাংলাদেশ সরকার পক্ষে জেলা প্রশাসক ৩২.৩৯ একর মাঠ, শিশুপার্ক, রাস্তা
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পক্ষে বগুড়া সেনানিবাস ২১.৯৯ একর ব্যবহৃত হচ্ছে বাগান, খেলার মাঠ, মাজার, মসজিদ হিসাবে।
বাংলাদেশ খাদ্য বিভাগ ৪.০৬ একর (গোডাউন)
সি.এস.ডি গুদাম ৬.৬৪ একর (গোডাউন, মসজিদ, পুকুর)
গণপূর্ত বিভাগ ২.৩৫ একর (অফিস)
স্টেশন ক্লাব ১.৬৮ একর (ক্লাব)
দিনাজপুর পৌরসভা ১.৯৬ একর (রাস্তা, ডাঙা
জেলা পরিষদ ১.৪২ একর রাস্তা
এই তালিকাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে রেকর্ডকৃত ২১.৯৯ একর জমির ব্যবহার হিসেবে উল্লেখ আছে: ‘বাগান’, ‘খেলার মাঠ’, ‘মাজার’, ‘মসজিদ’ এবং ‘পতিত’। এই শ্রেণীগুলো নিঃসন্দেহে জনসাধারণের ব্যবহারের প্রমাণ বহন করে।
সাধারণ মানুষই সত্যিকার দখলদার ছিল
ক্রীড়া ও সংস্কৃতির পীঠস্থান
দিনাজপুরে ব্রিটিশ আমলে কোনো স্টেডিয়াম ছিল না। এই মাঠেই যাবতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। ফুটবল জাদুকর ‘সামাদ’-এর প্রথম এবং শেষ ম্যাচ উভয়ই এই মাঠে হয়েছিল (১৯৪৫ সাল)। ব্রিটিশ আমলে ঘোড়দৌড়, পাকিস্তান আমলে নর নারায়ণ শীল্ড ফুটবল প্রতিযোগিতা সবই এই মাঠে।
বর্তমানেও ফুটবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স, ঘুড়ি উৎসব, বাণিজ্য মেলা, কৃষি মেলা নিরন্তর মানুষের পদচারণায় মুখর এই মাঠ।
জাতীয় ইতিহাসের স্মৃতিবিজড়িত স্থান
১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর দিনাজপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল এই মাঠেই। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি বড় মাঠকে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সাথে চিরতরে যুক্ত করেছে।
১৯৭২ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর আগমন উপলক্ষে নির্মিত মঞ্চ আজও এই মাঠে দণ্ডায়মান একটি জীবন্ত ইতিহাসের সাক্ষী।
সরকারি সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা-
১৯৮৩ সালের জরিপ প্রতিবেদন
১৯৮৩ সালের ২৭ মার্চ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় পরিচালিত জরিপে মাঠটির বাস্তব অবস্থার একটি বিস্তারিত চিত্র পাওয়া যায়। সেই জরিপে ঈদগাহ মাঠ, স্টেশন ক্লাব, পাকা রাস্তা, মাজার, P.W.D. অফিস, শিশু পার্ক, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মাঠ — সবই আলাদাভাবে চিহ্নিত। কোথাও কোনো সামরিক স্থাপনার উল্লেখ নেই।
১৯৮৯ সালের রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত
১৯৮৯ সালের ১৪ জুন তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি তথা সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক স্বয়ং সিদ্ধান্ত দেন যে, বড় মাঠে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২৮.৫০২ একর জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে হস্তান্তর করা হবে।
এই সিদ্ধান্তটি গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সর্বোচ্চ সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই জমির নিয়ন্ত্রণ বেসামরিক প্রশাসনের হাতে থাকা উচিত। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কার্যত স্বীকৃত হয়েছে যে, জমিটি সামরিক ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত বা প্রয়োজনীয় নয়।
সুপ্রীম কমান্ড হেডকোয়ার্টার্স, যৌথ প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ঢাকা সেনানিবাসের ১৪ জুন ১৯৮৯ তারিখের স্মারকে স্পষ্টভাবে বলা হয়: “উক্ত জমি বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে সমর্পণ করার জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সদয় সম্মতি প্রদান করিয়াছেন।”
২০০৩ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনের সিদ্ধান্ত
২০০৩ সালে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, বড় মাঠে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জমি সর্বসাধারণের ব্যবহার্য হিসেবে ‘যেমন আছে তেমন’ রাখা হবে।
এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ের এই রায় কার্যত নির্ধারণ করে দিয়েছে যে, এই মাঠ জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত।
২০০৭ সালের মতবিনিময় সভা
২০০৭ সালের ১৬ মে বড় মাঠ বিষয়ে ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জি.ও.সি এবং রংপুর এরিয়া কমান্ডারের দিনাজপুর সার্কিট হাউসে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার অনুষ্ঠান থেকেই বোঝা যায় যে, সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেরাও এই মাঠের স্বত্ব নিয়ে নিশ্চিত ছিল না এবং আলোচনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল।
প্রথা ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের অধিকার
বাংলাদেশের আইনি ঐতিহ্যে ‘দীর্ঘমেয়াদী নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার’ একটি আইনগত স্বীকৃতি তৈরি করে। এই মাঠে ১৯৪৭ সাল থেকে ঈদের জামাত হচ্ছে এটি দশকের পর দশক ধরে লক্ষ মানুষের ধর্মীয় অধিকার। এই অধিকার শুধু কাগজের রেকর্ডের প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের মৌলিক ধর্মাচরণের প্রশ্ন।
জনস্বার্থ বনাম প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ
একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় যখন জনস্বার্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ মুখোমুখি দাঁড়ায়। দিনাজপুরের বড় মাঠ সেই পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
এই মাঠটি দিনাজপুর শহরের একমাত্র বড় উন্মুক্ত সবুজ অঞ্চল। আধুনিক নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে এ ধরনের উন্মুক্ত স্থান একটি শহরের অপরিহার্য অঙ্গ। শহরের বায়ু পরিশোধন, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সংহতিতে এই মাঠের ভূমিকা অপরিমেয়।
রেকর্ড ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব
সি.এস. রেকর্ডে নাম থাকা মানেই স্থায়ী দখলি স্বত্ব নয়। বিশেষত যখন: – রেকর্ডের পরেও মাঠটি জনসাধারণ কর্তৃক নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে – উচ্চতম সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেই জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – মন্ত্রিপরিষদ জনব্যবহার অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন – আর.এস. জরিপে মাঠের অধিকাংশ জমি জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ডভুক্ত
বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যত অবকাঠামো ও উপস্থিতি
বর্তমানে মাঠে বিদ্যমান স্থাপনাগুলোর একটি তালিকা হচ্ছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, দিনাজপুর পোর্টস ডিসপ্লে, শিশু পার্ক (পুরাতন ও নতুন), গোর-এ-শহীদ জামে মসজিদ, শাহ আমির উদ্দীন ঘুরী (র.) মাজার, হাজী মোহাম্মদ দানেশের মাজার, স্টেশন ক্লাব, হেলিপ্যাড (জরুরি নাগরিক ব্যবহারের জন্য), ক্রিকেট একাডেমি, ফুটবল মাঠ ইত্যাদি।
এই তালিকার প্রতিটি উপাদান জনমানসের, জনজীবনের। একটিও সামরিক উদ্দেশ্যে নির্মিত নয়।
মন্তব্য: দিনাজপুরের বড় মাঠ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রের বিষয় নয়, এটি একটি সভ্যতার প্রতীক। সি.এস. রেকর্ডের একটি কলামে যাই লেখা থাকুক না কেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে এই মাঠ কখনো কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সম্পত্তি ছিল না। এটি ছিল, আছে এবং থাকবে দিনাজপুরের লক্ষ মানুষের।
১৭৮৭ সাল থেকে শহরের যাত্রা শুরু — তখন থেকে আজ পর্যন্ত এই মাঠ প্রতিদিন মানুষের ব্যবহারে জীবন্ত। এখানে সুফি সাধকের মাজার আছে, স্বাধীনতার প্রথম পতাকার স্মৃতি আছে, লক্ষ মানুষের ঈদের নামাজের আয়োজন আছে, শিশুর প্রথম দৌড়ের মাঠ আছে।
এই ইতিহাস কোনো দলিলের চেয়ে বড়। এই ব্যবহার কোনো খতিয়ানের চেয়ে সত্যিকার। এই মানুষের অধিকার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দাবির চেয়ে পুরনো।
সর্বোচ্চ সামরিক কর্তৃপক্ষের ১৯৮৯ সালের নিজস্ব সিদ্ধান্ত এবং মন্ত্রিপরিষদের ২০০৩ সালের নির্দেশনা — উভয়ই একই কথা বলে: এই মাঠ জনসাধারণের, জনসাধারণের জন্য।
ইতিহাস এই রায় দিয়েছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এই রায় সমর্থন করেছে। এখন শুধু দরকার সেই রায়ের বাস্তবায়ন।
________________________________________
তথ্যসূত্র:
১। F.O. Bell-এর Final Report on the Survey and Settlement Operations in the District of Dinajpur, 1934-1940
২। জেলা প্রশাসন, দিনাজপুর কর্তৃক প্রণীত ‘দিনাজপুর বড়মাঠের ইতিবৃত্ত’ প্রকাশকাল ২০১৪ খৃ: (রচনায়: মুহাম্মদ আব্দুল হালিম টলস্টয়, তৎকালীন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট);
৩। দিনাজপুর জেলার ইতিহাস সমগ্র; ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার; জেলা রেকর্ড রুম, দিনাজপুর; বাস্তব অবস্থা সরেজমিন পর্যবেক্ষণ।
লেখক: শামীম আল রাজী, সাবেক জেলা প্রশাসক, দিনাজপুর এর ভেরিফাইড ফেসবুক থেকে সংগ্রহ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও সংবাদ পড়ুন
bdit.com.bd