শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
চাকরির আশায় দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করেও ভাগ্যের সিঁকে ছেঁড়ে না সবার। দেশে তাই হু হু করে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। সরকারি চাকরি পরিণত হয়েছে সোনার হরিণে। তবে পয়সা থাকলেই এসব চাকরি নাগালের মধ্যে এনে দিয়ে ‘অলৌকিক’ এক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন সৈয়দ আবেদ আলী। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক এই গাড়িচালক প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে অযোগ্য বহু প্রার্থীরই যে ভাগ্য বদলেছেন তা নয়, গড়েছেন নিজের ভাগ্যও। সামান্য চালক থেকে পরিণত হয়েছেন তথাকথিত শিল্পপতিতে। প্রশ্নফাঁসের টাকা সাদা করতে খোলেন একের পর এক অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান। এমনকি প্রশ্নফাঁসের টাকা নিতে আত্মীয়স্বজনের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে পরিচালনা করতেন নিজেই। তথ্য বলছে, চাকরির পরীক্ষা এলেই এসব অ্যাকাউন্টে বেড়ে যেত লেনদেন। আবেদ আলীর এমন অন্তত ১৬টি অ্যাকাউন্টের সন্ধান মিলেছে। যেখানে অন্তত ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আবেদ আলী চক্রের ১১৫টি অ্যাকাউন্টে ১২৫ কোটি টাকা লেনদেন করা হয়েছে।
প্রশ্নফাঁসের বিপুল কালো টাকা: আবেদ আলীর প্রশ্নফাঁসের চক্রটিতে আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান, ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলাম ও বিপাশ চাকমা, ছাত্রলীগ নেতা কামরুজ্জামান সুইট, মাহবুবুর রহমান দীপুসহ পিএসসির প্রায় এক ডজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর খোঁজ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের কয়েকজন আটক হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তি দিলেও পিএসসি জানিয়েছে, তারা প্রশ্নফাঁসের কোনো প্রমাণ পায়নি। তবে কালবেলার অনুসন্ধানে আবেদ আলীর প্রশ্ন কেনাবেচার বিশদ চিত্র ফুটে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে প্রশ্নফাঁসের লেনদেনে জড়িত এমন অন্তত ১১৫টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা। বর্তমানে স্থগিত (ফ্রিজ) এসব অ্যাকাউন্টে ১২৫ কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৯৫০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে অর্ধেকই আবেদ আলী, তার স্ত্রী-সন্তান ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে। অনুসন্ধানে নেমে আবেদ আলীর এই চক্রে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান মান্নারও সম্পৃক্ততা পেয়েছে কালবেলা। নথিপত্র বলছে, পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে ৭টি ব্যাংকে
২০টির বেশি অ্যাকাউন্ট খুলেছেন আবেদ আলী। এর মধ্যে ডাচ-বাংলা ব্যাংকে ৭টি অ্যাকাউন্ট, একটি এফডিআর ও একটি ক্রেডিট কার্ড রয়েছে তার। সিয়াম ট্রেডার্স ও রাশিদা ট্রেডার্স নামে দুটি কারেন্ট অ্যাকাউন্ট রয়েছে এই ব্যাংকে। রাশিদা ট্রেডার্স অ্যাকাউন্টে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ৪৯০ টাকা ও সিয়াম ট্রেডার্সে ৩ কোটি ১৫ লাখ ২১ হাজার ৪০০ টাকা জমা হয়েছে। রাশেদা ট্রেডার্সের অ্যাকাউন্টটি খোলা হয়েছে গত বছরের ৩০ মার্চ। আর ছেলের নামে সিয়াম ট্রেডার্সের অ্যাকাউন্ট খোলা হয় দুই মাস পর ১৭ মে। এর ঠিক আট দিন পর একই ব্যাংকে (ডাচ-বাংলা) আবেদ আলী ৫০ লাখ টাকার একটি এফডিআর করেন। এই ব্যাংকটিতে তার মোট জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি টাকা, যার অধিকাংশই নগদ জমা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংক এশিয়ায় পাঁচটি অ্যাকাউন্টে ২০১৭ সালের জুলাই মাস থেকে জমা হয়েছে ১২ কোটি ১২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৮৪ টাকা। এর মধ্যে দোলন রাইস শপের অ্যাকাউন্টে ৫ কোটি ৭২ লাখ, ইউএসএ বিল্ডার্সের অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ২৮ লাখ, সিয়াম রেন্ট-এ কারের অ্যাকাউন্টে প্রায় ১ কোটি, আবেদের নিজের নামের অ্যাকাউন্টে প্রায় ৫ কোটি এবং স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে পৌনে ৬ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এসব টাকার বড় অংশ জমার পরপরই আবার নগদে তুলে নেওয়া হয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকে স্ত্রী শাহরিন আক্তার শিল্পীর নামে ৩টি এবং ঢাকা ব্যাংকে ছেলে সিয়ামের নামে দুটি অ্যাকাউন্ট খুলেছেন আবেদ। ২০০৮ থেকে ৯ সালের মধ্যে আবেদ আলী পূবালী ব্যাংকে তিনটি অ্যাকাউন্ট খোলেন। কাছাকাছি সময়ে সোনালী ব্যাংকেও দুটি অ্যাকাউন্ট ছিল তার। তখন পিএসসিতে গাড়িচালকের চাকরি করলেও অ্যাকাউন্টগুলোয় প্রায় দেড় কোটি টাকা জমা করেন আবেদ। কিন্তু ২০১৪ সালে প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় চাকরি হারালে প্রায় সব অ্যাকাউন্টই বন্ধ করে দেন তিনি।
ভুয়া কোম্পানি খুলে লেনদেন: প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয় করার পর সেগুলো সাদা করতে রাইস মিল, রেন্ট-এ কার, আবাসন থেকে শুরু করে নানা ভুয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন আবেদ আলী। নিজের পাশাপাশি মালিক হিসেবে ব্যবহার করেন স্ত্রী, সন্তান, এমনকি শাশুড়ি-শ্যালকের নামও। অনুসন্ধানে নেমে আবেদ আলীর একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স এসেছে কালবেলার হাতে। এসব কোম্পানির ট্রেড লাইসেন্সের তথ্যে ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। ২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ১১৩/১, মধ্য পীরের বাগ, মিরপুরের ঠিকানায় ‘সৈয়দ আবেদ আলী রাইস এজেন্সি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সে নেন তিনি। সেখানে বসবাসের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে, ৬৫/২, মধ্য পীরের বাগ, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬। একই ঠিকানা ব্যবহার করে পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে ‘সিয়াম রেন্ট-এ কার’, ‘আলিফ এন্টারপ্রাইজ’, ‘মেসার্স দোলন রাইস শপ’ গড়ে তোলা হয়। তবে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে এই দুটি ঠিকানায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অতীতেও ওই ঠিকানায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ১১৩/১ ঠিকানায় আবেদ আলী বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ট্রেড লাইসেন্স নিলেও বাস্তবে ওই ঠিকানায় ‘ব্রাদার্স হেয়ার কাট সেলুন’ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ৬৫/২ ঠিকানায় সৈয়দ রেসিডেন্স নামে একটি বহুতল ভবন রয়েছে। এ ছাড়া ২০২২ সালের ৩ আগস্ট সৈয়দ আবেদ আলীর শাশুড়ি রাশিদা বেগমের নামে মেসার্স রাশিদা ট্রেডার্স নামে একটি ট্রেডলাইসেন্স নেওয়া হয় মাদারীপুর পৌরসভা থেকে। ঠিকানা দেওয়া হয় মাদারীপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড। আর মালিকানা দেখানো হয় আবেদ আলীর শ্যালক খলিল খানের নামে। লাইসেন্স নম্বর: ০২-০০০৮৭৫। তবে সরেজমিন মাদারীপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা ঘুরে রাশিদা ট্রেডার্স নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এসব অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য এসেছে কালবেলার হাতে।
পরীক্ষা এলেই নগদ অর্থ জমা হয় অ্যাকাউন্টে: আবেদ আলী ও তার সহযোগীদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি সংগ্রহ করেছে কালবেলা। তাদেরই একজন আইসিটি বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোজাহিদুল ইসলাম। জবানবন্দিতে তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছরের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত রেলের উপসহকারী প্রকৌশলী পরীক্ষায় আবেদ আলীর সঙ্গে প্রার্থীপ্রতি ১৬ লাখ টাকায় তার চুক্তি হয়। এর মধ্যে প্রথমে ১০ লাখ, পরে ৬ লাখ টাকা দেওয়ার কথা হয়। চুক্তিমতো আবেদ আলীকে রাশেদা ট্রেডার্সের ডাচ-বাংলার অ্যাকাউন্টে ৩০ লাখ টাকা দেন তিনি। প্রার্থীদের কাছ থেকে মোজাহিদুল নিজে নেন ১ কোটি টাকা। মোজাহিদ তার জবানবন্দিতে আরও স্বীকার করেন, ২৪, ২৫, ২৭ থেকে প্রায় প্রতিটি বিসিএসের প্রশ্ন তারা ফাঁস করেছেন এবং তাদের প্রশ্ন নিয়ে বিপুলসংখ্যক লোক বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন।
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের রাশিদা ট্রেডার্সের অ্যাকাউন্টের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে মোজাহিদুল ইসলামের জবানবন্দির সত্যতা মিলেছে। রাশিদা ট্রেডার্সের অ্যাকাউন্টে দেখা যায়, ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা মাদারীপুর নতুন বাসস্ট্যান্ড দেওয়া হলেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করা হয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের শেওড়াপাড়া ব্রাঞ্চে। হিসাব নম্বর : ৩০৮১১০০০০৭৫২৯। শাশুড়ির নামে শ্যালকের পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট হলেও অ্যাকাউন্টে দেওয়া ফোন নম্বরটি আবেদ আলীর নামে রেজিস্ট্রেশন করা। এ ছাড়া আবেদ আলীর নিজের হাতের লেখা একটি ডায়েরি এসেছে কালবেলার হাতে। সেই ডায়েরির লেখার সঙ্গে অ্যাকাউন্ট খোলার আবেদনপত্রের হাতের লেখার হুবুহু মিল রয়েছে। অর্থাৎ এই অ্যাকাউন্টটি শ্যালকের পরিচয় ব্যবহার করে আবেদ আলী নিজেই পরিচালনা করছেন।
ব্যাংকের স্টেটমেন্টে দেখা যায়, রাশেদা ট্রেডার্সের অ্যাকাউন্টে ২০২৩ সালের ৩০ মার্চ থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত জমা হয়েছে ৪ কোটি ৪৬ লাখ ৫২ হাজার ৪৯০ টাকা। তুলে নেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ২৩ লাখ ৩ হাজার ২৯২ টাকা। বাকি টাকাসহ অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে ফ্রিজ অবস্থায় আছে। লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার সময় অ্যাকাউন্টটিতে অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ১৯ মে ছিল ৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। এই পরীক্ষার আগের মাসে অর্থাৎ এপ্রিলে রাশেদা ট্রেডার্সের অ্যাকাউন্টে জমা হয় মাত্র ১০ লাখ টাকা। অন্যদিকে মে মাসে জমা হয় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা। জুন মাসে আবার জমা হয় মাত্র সাড়ে ১০ লাখ টাকা। তবে জুনে উত্তোলন করা হয় ৬০ লাখ টাকা। এরপর চলতি বছরের ৫ জুলাই রেলের উপসহকারী প্রকৌশল পরীক্ষার সময় ফের অস্বাভাবিক লেনদেন দেখা যায়। এ সময় এপ্রিলে ৪ লাখ টাকা জমা হলেও সেই টাকা আবার তুলে নেওয়া হয়। মে মাসে ২ লাখ করে তিনটি লেনদেনে ৬ লাখ টাকা জমা করে একই দিন তা আবার তুলে নেওয়া হয়। তবে পরীক্ষার আগের মাসে অর্থাৎ জুনে এসে জমা হয় ৮৮ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। আর জুলাইয়ের প্রথম তিন দিনে জমা হয় ৩৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা।
আদালতে আবেদ আলী তার জবানবন্দিতে মাহমুদ হাসান মান্না নামের এক ব্যক্তির কথা বলেছেন। এই মান্না রেলের উপসহকারী প্রকৌশলী পরীক্ষায় তাকে ১১ জন প্রার্থী দিয়েছেন বলেও স্বীকার করেছেন।
এই মান্নার পরিচয় খুঁজে বের করেছে কালবেলা। মান্না গাজীপুরের ডুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। কেবল একটি পরীক্ষায় প্রার্থী দেওয়াই নয়, আবেদ আলী পরিবারের এই মান্নার রয়েছে গভীর ব্যবসায়ীক যোগাযোগ। মান্না, আবেদ, তার স্ত্রী শিল্পী এবং সন্তান সিয়ামের যৌথ মালিকানায় ১১ দশমিক ১৮ অযুতাংশ জমি ক্রয় বাবদ ৫০ লাখ টাকার একটি বায়নানামার দলিল সংগ্রহ করেছে কালবেলা। দলিলে জমির মোট দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি ডাচ-বাংলা ব্যাংকে ওই জমির দলিল দিয়ে আবেদ ও মান্না একটি জয়েন্ট অ্যাকাউন্টও খোলেন। আবেদনে জমি ক্রয় ও উন্নয়ন কাজের জন্য জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই অ্যাকাউন্টের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে রাশিদা ট্রেডার্সের মতোই বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার আগে-পরে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। অ্যাকাউন্টটিতে ১৫ জানুয়ারি ২০২৩ থেকে ৩০ জুন ২০২৪ পর্যন্ত মাত্র দেড় বছরে ৯৩ লাখ ৯৩ হাজার ৮৪৩ টাকা জমা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা তুলেও নিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অ্যাকাউন্টটিতে সবচেয়ে বেশি টাকা জমা হয়েছে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে। ওই বছরের ১৮ মার্চ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ইনস্ট্রাক্টর ও জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর নিয়োগের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষার পরদিন ১৯ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মাত্র পাঁচ দিনে অ্যাকাউন্টটিতে জমা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। এরপর ২৮, ২৯ ও ৩০ মার্চ যথাক্রমে ২০ লাখ, ১৭ লাখ ও ১৯ লাখ করে চেকের মাধ্যমে মোট ৫৬ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ১৯ মার্চ, অর্থাৎ পরীক্ষার পরের দিন রাজিব ঘরামি ও সম্পা বেপারি নামের একটি জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে আবেদ আলী ও মান্নার অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা ট্রান্সফার করা হয়। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ১০ অক্টোবর ২০২২ সালে ১ হাজার টাকা জমা দিয়ে অ্যাকাউন্টটি খোলা হয়। এরপর ১২ মার্চ ২০২৩ সালে ৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা ক্যাশ ডিপোজিট করা হয়। ১৯ মার্চ জমা দেওয়া হয় আরও ৭০০ টাকা। এরপর অনলাইনের মাধ্যমে আবেদ আলী ও মান্নার জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা ট্রান্সফার করা হয়। অ্যাকাউন্টটিতে এর বাইরে আর কোনো লেনদেন নেই। অ্যাকাউন্টে দেওয়া নম্বরে ফোন করা হলে সেটি সচল পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মিঠুন চন্দ্র দাস নামের রূপালী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে ২ মার্চ ৮ লাখ টাকা এবং ১৯ মার্চ দুইবারে ১০ লাখ টাকাসহ মোট ১৮ লাখ টাকা জমা করা হয়। সেই টাকা আবেদ আলী ও মান্নার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয় একই দিনে।
তবে এ বিষয়ে জানতে মিঠুন চন্দ্র দাসকে ফোন দেওয়া হলে তিনি আবেদ আলী বা মান্না নামের কাউকে চেনেন না বলে জানান। ১৮ লাখ টাকা ট্রান্সফারের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।
আবেদ আলীর ও তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট হিসাবে টাকা পাঠানো ব্যক্তিদের ফোন করা হলে অধিকাংশ নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। যে কয়টি নম্বর খোলা পাওয়া যায়, তারা সবাই টাকা পাঠানোর বিষয়টি অস্বীকার করে আবেদ আলী কিংবা চক্রের কাউকে চেনেন না বলে জানান।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দ আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়াম সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। নিয়োগ পরীক্ষার সময়ে অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়টি শুনে হেসে বলেন, ‘এগুলো আমাদের ব্যবসায়িক লেনদেন। ব্যবসায়িক লেনদেন হতে পারে না।’ মাহমুদ হাসান মান্নার বিষয়ে প্রথমে বলেন তাকে চেনে না। পরে জমির দলিল ও জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের বিষয়ে উল্লেখ করলে বলেন, ‘ওহ, গাজীপুরের। উনি আব্বুর পরিচিত।’
সিআইডির জালে পিএসসির অফিস সহকারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী: পিএসসির বাংলাদেশ রেলওয়ের সাব-এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার (নন-ক্যাডার) পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তারা হলেন অফিস সহকারী মো. আব্দুল আজিম ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী রুপন চন্দ্র দাস। মঙ্গলবার বিপিএসসি প্রধান কার্যালয়ের সামনে থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, বিপিএসসির বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। এর আগে এই ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে ২০ জন গ্রেপ্তার এবং দুজন আত্মসমর্পণ করেছেন।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. আজাদ রহমান জানান, গ্রেপ্তার দুজন বিগত বছরগুলোতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিসিএসসহ পিএসসির বিভিন্ন গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।