Pallibarta.com | দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’র তৃতীয় বর্ষপূর্তি আজ - Pallibarta.com

বুধবার, ১ ডিসেম্বর ২০২১

দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’র তৃতীয় বর্ষপূর্তি আজ

‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’র তৃতীয় বর্ষপূর্তি আজ ফাইল ছবি
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে উপকূলীয় অধিবাসীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকা। জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের আগে তাদের বড় আতঙ্ক ছিল জলদস্যু ও বন দস্যুদের উৎপাত। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই হিসাবে আজ ‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’র তৃতীয় বর্ষপূর্তি।

প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা, দিকনির্দেশনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও র‌্যাবের কর্মতৎপরতায় দস্যুমুক্ত হয় সুন্দরবন। এ সাফল্য অর্জনে র‌্যাব পেয়েছে দেশবাসীর আকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসা।

দস্যুমুক্ত সুন্দরবন দিবসের তৃতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জলদস্যু পুনর্বাসন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সোমবার (১ নভেম্বর)। এতে বাগেরহাটের রামপালে আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুদের পুনর্বাসন করা হবে।

অনুষ্ঠানে র‌্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের মধ্যে ঘর, মুদিদোকান (মালামালসহ), জাল, মাছ ধরার নৌকা, ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও গবাদিপশু উপহার দেবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমদে ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম।

এছাড়া খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. শামসুল হক টুকু, খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য সেখ সালাহউদ্দিন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. হাবিবুর রহমান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পীর ফজলুর রহমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দবেন র‌্যাবের অরিতিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল কে এম আজাদ।

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজখ্যাত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। জলদস্যু ও বনদস্যুদের তাণ্ডবে আশির দশক থেকে জিম্মি হয়ে পড়েছিল এ উপকূলের বনজীবী ও মৎস্যজীবীরা। অবৈধভাবে গাছ কাটা, বন্যপ্রাণী হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ না পেয়ে মানুষ হত্যা, ডাকাতি ও ট্রলার ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে পড়েছিল জলদস্যু-বনদস্যুদের কাছে।

২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে র‌্যাব মহাপরিচালককে প্রধান সমন্বয়কারী করে সুন্দরবনে জলদস্যু দমনে টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে গোড়াপত্তন ঘটে জলদস্যু মুক্তকরণ প্রক্রিয়ার। ২০১২ সাল থেকে লিড অ্যাজেন্সি হিসেবে র‌্যাবের জোড়ালো অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়ে জলদস্যুরা। উপর্যুপরি অভিযানে ফেরারি জীবনের অবসান ঘটিয়ে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেয় তারা।

প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্তাবধানে ও র‌্যাবের ব্যবস্থাপনায় ২০১৬ সালের ৩১ মে থেকে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য, ৪৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। ফলে সম্পূর্ণরূপে জলদস্যু মুক্ত হয় সুন্দরবন।

এরপর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী এ সাফল্যের ঘোষণা দেন। গত তিন বছর র‌্যাব এ সাফল্য ধরে রেখেছে।

২০১৬ সালের চিত্র
৩১ মে মাস্টার বাহিনীর ১০ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৫২টি অস্ত্র ও ৩ হাজার ৯০৪ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১৫ জুলাই মজনু বাহিনীর ৯ জন সদস্য ও ইলিয়াস বাহিনীর ২ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। মজনু বাহিনী কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৫টি অস্ত্র ও ১ হাজার ২০ রাউন্ড গোলাবারুদ। ৮ আগস্ট শান্ত বাহিনীর ১৪ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২০টি অস্ত্র ও ১ হাজার ৮ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২০ অক্টোবর সাগর বাহিনীর ১৩ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২০টি অস্ত্র ও ৫৯৬ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৮ নভেম্বর খোকাবাবু বাহিনীর ১২ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২২টি অস্ত্র ও ১ হাজার ৩ রাউন্ড গোলাবারুদ।

২০১৭ সালের চিত্র
৭ জানুয়ারি নোয়া বাহিনীর ১২জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৫টি অস্ত্র ও ১ হাজার ১০৫ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৯ জানুয়ারি জাহাঙ্গীর বাহিনীর ২০ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩১টি অস্ত্র ও ১ হাজার ৫০৭ রাউন্ড গোলাবারুদ। ৩০ মার্চ ছোট রাজু বাহিনীর ১৫ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২১টি অস্ত্র ও ১ হাজার ২৩৭ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৯ এপ্রিল আলিফ বাহিনীর ২৫ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৩১টি অস্ত্র ও ১ হাজার ১১০ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ নভেম্বর মনজু বাহিনীর ১১ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৯টি অস্ত্র ও ৮৫৩ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ নভেম্বর মজিদ বাহিনীর ৯ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৪টি অস্ত্র ও ৪৭৬ রাউন্ড গোলাবারুদ।

২০১৮ সালের চিত্র
১৬ জানুয়ারি বড় ভাই বাহিনীর ১৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮টি অস্ত্র ও ১ হাজার ৪২২ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১৬ জানুয়ারি ভাই ভাই বাহিনীর ৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৮টি অস্ত্র ও ৩২২ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১৬ জানুয়ারি সুমন বাহিনীর ১২ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১২টি অস্ত্র ও ১ হাজার ২১৫ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ এপ্রিল ডন বাহিনীর ১০ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১০টি অস্ত্র ও ৩৪১ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ এপ্রিল ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর ৯ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৯টি অস্ত্র ও ৫৯৩ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ এপ্রিল ছোট সুমন বাহিনীর ৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৯টি অস্ত্র ও ১৪৭ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৩ মে দাদা ভাই বাহিনীর ১৫ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১২টি অস্ত্র ও ১৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৩ মে হান্নান বাহিনীর ৯ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৮টি অস্ত্র ও ১৩০ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৩ মে আমির আলী বাহিনীর ৭ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৫টি অস্ত্র ও ৪১ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৩ মে সূর্য বাহিনীর ১০ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১১টি অস্ত্র ও ৩৭০ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৩ মে ছোট সামসু বাহিনীর ৯ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১০টি অস্ত্র ও ৩১০ রাউন্ড গোলাবারুদ। ২৩ মে মুন্না বাহিনীর ৭ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১২টি অস্ত্র ও ২৫৫ রাউন্ড গোলাবারুদ।

১ নভেম্বর আনোয়ার বাহিনীর ৮ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১০টি অস্ত্র ও ৫২ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ নভেম্বর তইবুর বাহিনীর ৫ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৪টি অস্ত্র ও ৩১৩ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ নভেম্বর সিদ্দিক বাহিনীর ৭ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৭টি অস্ত্র ও ১ হাজার ৪০৩ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ নভেম্বর আলামিন বাহিনীর ৫ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৫টি অস্ত্র ও ৫২০ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ নভেম্বর সাত্তার বাহিনীর ১২ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৩টি অস্ত্র ও ৮৯৫ রাউন্ড গোলাবারুদ। ১ নভেম্বর শরীফ বাহিনীর ১৭ জন সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৯টি অস্ত্র ও ১৬৮ রাউন্ড গোলাবারুদ।

সর্বমোট ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়, অস্ত্র উদ্ধার করা হয় ৪৬২টি এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয় ২২ হাজার ৫০৪ রাউন্ড।

র‌্যাব জানায়, আত্মসমর্পণের পরে পুনর্বাসনে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সাবেক জলদস্যুদের প্রত্যেককে নগদ এক লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া, সরকারের আইনি সহায়তা ও র‌্যাবের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তাসহ সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ফলে সুন্দরবনের সব জলদস্যুরা আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে। সম্প্রতি র‌্যাব পুনর্বাসন চাহিদা সমীক্ষা চালিয়ে আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুদের মধ্যে ঘর, দোকান, নৌকা, জাল ও গবাদি পশু হস্তান্তর করতে যাচ্ছে। যা তাদের স্বাবলম্বী হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বর্তমানে শান্তির সু-বাতাস বইছে সুন্দরবনে। অপহরণ-হত্যা এখন তিরোহিত। জেলেদের কষ্টার্জিত উপার্জনের ভাগও কাউকে দিতে হচ্ছে না। মাওয়ালী, বাওয়ালী, বনজীবী, বন্যপ্রাণী এখন সবাই নিরাপদ। নির্ভয়ে নির্বিঘ্নে আসছে দর্শনার্থী-পর্যবেক্ষক, জাহাজ বণিকেরা। এভাবেই সরকারের দূরদর্শিতায় সুন্দরবন কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ব্যাপক সম্ভবনার দ্বার উন্মোচিত হল।

আজ এ দিবস উপলক্ষে র‌্যাব জলদস্যু মুক্ত সুন্দরবন গঠনে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বনবিভাগ, স্থানীয় আপামর জনসাধারণ, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছে র‌্যাব।

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১