পারস্য উপসাগরের আকাশে আজ যে বারুদের গন্ধ ভাসছে, তা কেবল দুই রাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনার ধোঁয়া নয়—এ যেন সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতির শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়া এক অদৃশ্য আতঙ্ক। পৃথিবী এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে কূটনীতির প্রতিটি শব্দের পেছনে লুকিয়ে আছে যুদ্ধের সম্ভাব্য বজ্রধ্বনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump-এর কঠোর অবস্থান এবং “অন্য উপায়ের” ইঙ্গিত বিশ্বরাজনীতিকে আরও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
এই উত্তপ্ত সময়কে ঘিরে প্রতিবেশী India ইতোমধ্যেই সতর্কতার পথ বেছে নিয়েছে। তারা বুঝেছে—যুদ্ধের আগুন সীমান্ত মানে না; তার ছাই এসে পড়ে বাজারে, মানুষের পাতে, শ্রমিকের ঘামে, এবং রাষ্ট্রের রিজার্ভে। অথচ Bangladesh এখনো যেন ঝড়ের পূর্বাভাসকে দূরের মেঘ ভেবে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, অর্থনৈতিক বিপর্যয় কখনো হঠাৎ আসে না—তা আগে নিঃশব্দে দরজায় কড়া নাড়ে।
১. যুদ্ধের অভিঘাত: অর্থনীতির ভাঙনের পূর্বসংগীত
যদি ইরান-আমেরিকা সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি হবে।
জ্বালানি তেলের অগ্নিমূল্য
হরমুজ প্রণালী যেন পৃথিবীর জ্বালানি প্রবাহের ধমনী। সেখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দামে দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। তেলের মূল্য বাড়া মানেই বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, কৃষি ও বিদ্যুতের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। তখন উন্নয়নের চাকা ঘুরবে ঠিকই, কিন্তু তার শব্দে চাপা পড়ে যাবে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
রেমিট্যান্সের অনিশ্চয়তা
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে লাখো বাংলাদেশি শ্রমিক নিজেদের স্বপ্নের সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন। যুদ্ধ যদি সেই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার তখন মরুভূমির কূপের মতো ক্রমশ শূন্য হতে শুরু করবে।
মুদ্রাস্ফীতির করাল ছায়া
আমদানিনির্ভর বাজারে এলসি খরচ বৃদ্ধি পেলে নিত্যপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। চাল, ডাল, তেল—সবকিছু যেন ধীরে ধীরে মধ্যবিত্তের থালা থেকে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে নির্মম রূপ হলো—মানুষের ক্ষুধা।
২. ভারতের ‘যুদ্ধকালীন অর্থনীতি’ বনাম বাংলাদেশের নীরবতা
Narendra Modi-এর সাম্প্রতিক আহ্বানে একটি সুস্পষ্ট বার্তা রয়েছে—যুদ্ধ কেবল সীমান্তে হয় না, অর্থনীতিতেও হয়। বিলাসিতা কমানো, জ্বালানি সাশ্রয়, সোনা কেনা নিরুৎসাহিত করা—এসব পদক্ষেপ মূলত এক ধরনের ‘War-time Economy’-এর প্রস্তুতি।
অন্যদিকে বাংলাদেশে এখনো সেই মাত্রার জাতীয় প্রস্তুতির দৃশ্য স্পষ্ট নয়। আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি এবং কার্যকর নীতিগত বার্তার অভাবে পরিস্থিতি যেন অদৃশ্য ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের মহাসড়কে কখনো কখনো গতি কমানোই টিকে থাকার একমাত্র উপায়—কারণ সবসময় দ্রুত চলা প্রজ্ঞার পরিচয় নয়।
৩. বাংলাদেশের জন্য জরুরি করণীয়
ক) কঠোর কৃচ্ছতা নীতি
যেসব উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল আমদানিনির্ভর ব্যয় রয়েছে, সেগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত বা ধীর করা জরুরি। বিদেশ ভ্রমণ, বিলাসপণ্য ক্রয় এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় সীমিত করতে হবে। সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকাই হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বর্ম।
খ) জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়
আজ যে আলো অকারণে জ্বলছে, আগামীকাল সেই বিদ্যুৎ হয়তো শিল্পকারখানার প্রয়োজন হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহনকে উৎসাহ দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
গ) খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ
নিচুতলার মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওএমএস ও টিসিবির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে হবে। একই সঙ্গে মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কারণ যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ কখনো কখনো বন্দুক নয়—খালি বাজার।
ঘ) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা
অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি করা জরুরি। হুন্ডির অন্ধকার পথ বন্ধ না করতে পারলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
৪. উপসংহার: সময় এখন বাস্তবতার
যুদ্ধের শব্দ যখন দিগন্তে শোনা যায়, তখন রাষ্ট্রকে কেবল সাহসী হলেই চলে না—দূরদর্শীও হতে হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক নাজুক সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামান্য অসতর্কতাও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
প্রতিবেশী দেশের সতর্কতা আমাদের জন্যও এক স্পষ্ট বার্তা। জনগণকে বাস্তবতা জানানো, মিতব্যয়ী জীবনযাপনে উৎসাহিত করা এবং অর্থনৈতিক প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা এখন আর বিলম্ব করার বিষয় নয়।
কারণ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—
যুদ্ধের সময় সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র সেই নয়, যার অস্ত্র সবচেয়ে বেশি; বরং সেই, যে সংকটের আগেই নিজের ঘরকে প্রস্তুত করতে পারে।
শেষ কথা
প্রস্তুত না থাকা কেবল অদূরদর্শিতা নয়, এটি একটি জাতির অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়ার নাম। তাই এখনই সময়—প্রতিক্রিয়াশীল নয়, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ নেওয়ার।
কারণ ঝড় আসার আগে যে ঘর বাঁধে, শেষ পর্যন্ত আশ্রয় পায় তারাই।
লেখক: মোঃ খাদেমুল ইসলাম, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। দিনাজপুর, বাংলাদেশ।
-:সম্পাদকীয় কার্যালয়:-
উপশহর, দিনাজপুর-৫২০০।
ই-মেইল ঠিকানা: pallibartadnj@gmail.com
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ: ০১৮১৬ ৯৪৫৭৪৪
© স্বত্ব সংরক্ষিত পল্লীবার্তা© ২০২৫