প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ১২:৫২ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ
স্বর্ণশস্যের মাঠে কৃষকের আজন্ম ক্রন্দন ও অব্যক্ত আহাজারি

উত্তরের শস্যভাণ্ডার দিনাজপুর—যেখানে একসময় ধানের শিষে দুলতো আশার আলো, আজ সেখানে ভেসে বেড়ায় দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্রন্দন। বোরো মৌসুমে ১৩টি উপজেলাজুড়ে বাম্পার ফলন—প্রকৃতির আশীর্বাদ যেন উজাড় করে দিয়েছে তার ভান্ডার। অথচ সেই প্রাচুর্যের মাঝেও কৃষকের হৃদয়ে নেই কোনো উৎসব, নেই হাসির রেশ; বরং আছে এক নিঃশব্দ আহাজারি, যা বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা বঞ্চনার ভাষা।
জ্বালানি তেল, সার, বীজ, শ্রম—সবকিছুর খরচ বেড়েছে লাগামছাড়া। প্রতি বিঘায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক হাজার টাকা। অথচ বাজারে ধানের দাম সেই আগের মতোই, কোথাও কোথাও আরও কম। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালে প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকায় সংগ্রহ করা হবে—এই ঘোষণাও কৃষকের মুখে হাসি আনতে পারেনি। কারণ এই দামে বিক্রি মানেই লোকসানের ভার কাঁধে তুলে নেওয়া।
চিরিরবন্দর উপজেলার আমতলী ফকিরপাড়া গ্রামের কৃষক সাজ্জাদ আলী, যিনি প্রায় ১১ বিঘা জমিতে হাইব্রিড ও উফশী ধান আবাদ করেছেন, তার কণ্ঠে ফুটে ওঠে বাস্তবতার নির্মমতা—
“সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু ধানের দাম বাড়েনি। এই দামে বিক্রি করলে লোকসান হবেই।”
বিরল উপজেলায় এই মৌসুমে ১৫ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের আবাদ হয়েছে ৩৪৫ হেক্টর জমিতে এবং উফশী জাতের ধানের আবাদ হয়েছে ১৫ হাজার ৪১৫ হেক্টর জমিতে। বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার জানান, প্রতি হেক্টরে চালের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩.৫৮ মেট্রিক টন এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিরল উপজেলার বানিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক মনসুর আলীর গল্পও একই সুরে বাঁধা। সাড়ে তিন বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে ধান চাষ করেছেন তিনি। প্রকৃতি দিয়েছে ফলনের প্রাচুর্য, কিন্তু সেই প্রাচুর্য যেন তার জীবনে স্বস্তি নয়, বরং বাড়তি বোঝা।
“কৃষিকাজ এখন বোঝা হয়ে গেছে। তবুও চাষ করি—কারণ আর কোনো পথ নেই,”—নিরুপায় স্বীকারোক্তি তার।
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে ভিন্ন এক চিত্র। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মোঃ আনিছুজ্জামান জানান, জেলায় এক লক্ষ ৭৩ হাজার ২৩৭ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে এবং প্রায় সোয়া নয় লক্ষ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোঃ মনিরুল ইসলাম জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকায় সংগ্রহ করা হবে। আগামী ৫ মে থেকে দেশব্যাপী এই সংগ্রহ অভিযান শুরু হবে। তবে দিনাজপুর থেকে কতটুকু ধান ও চাল সংগ্রহ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসেনি।
সব মিলিয়ে দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ মাঠে আজ এক বৈপরীত্যের গল্প—সোনালি ফসলের প্রাচুর্য, কিন্তু কৃষকের ঘরে অভাবের দীর্ঘশ্বাস। বছরের পর বছর ধরে লোকসানের এই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে কৃষকের জীবন যেন এক অন্তহীন আর্তনাদে পরিণত হয়েছে। মাঝখানে অদৃশ্য এক স্বার্থান্বেষী চক্র লুটে নিচ্ছে তাদের ঘামের মূল্য—আর কৃষক, চিরকালীন সেই পরিশ্রমী মানুষটি, দাঁড়িয়ে আছে নিজেরই ফসলের সামনে পরাজিত এক নীরব যোদ্ধা হয়ে।
ই-মেইল ঠিকানা: pallibartadnj@gmail.com
© স্বত্ব সংরক্ষিত পল্লীবার্তা© ২০২৫