প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ১০:১০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ

উত্তরের জনপদ দিনাজপুর—যেখানে গ্রীষ্ম মানেই শুধু তাপদাহ নয়, বরং ডালে ডালে ঝুলে থাকা লাল সম্ভাবনার গল্প। সেই লিচু, যাকে অনেকে ভালোবেসে ডাকে “প্রাকৃতিক রসগোল্লা”, এখন গুটি হয়ে ধীরে ধীরে পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। তবে এবারের মৌসুমে সেই গুটির সংখ্যা কম—আর এই সামান্য ঘাটতিই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মনে তুলেছে অজানা শঙ্কার ঢেউ।
বিরল উপজেলার মহেশপুর গ্রামের আজিজুল ইসলাম—পেশায় মুহুরী, কিন্তু বাস্তবে লিচুর মৌসুমি অর্থনীতির এক নীরব কারিগর। সাত-আট বছর আগে যে পথচলা শুরু করেছিলেন শূন্য থেকে, আজ তা পৌঁছেছে লাখ টাকার বিনিয়োগে। প্রতি মৌসুমে ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার বাগান কেনা তার কাছে এখন নিয়মিত অধ্যায়। চলতি বছরেও প্রায় ৩৫ লাখ টাকার বাগান কিনেছেন তিনি।
তবে এবার হিসাবের খাতায় যেন একটু ঘাটতি—
“মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ গাছে গুটি এসেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি গুটি রক্ষা করতে। কিন্তু আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বড় চিন্তার কারণ,”—বললেন তিনি, যেন প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে আছে এক ব্যবসায়ীর হিসাব আর এক কৃষকের উৎকণ্ঠা।
এই অনিশ্চয়তার ছায়া পড়েছে মাধববাটীর আমজাদ হোসেনের বাগানেও।
ঝড়ে ভেঙে পড়া ডাল, ঝরে যাওয়া গুটি—সব মিলিয়ে তার চোখে এক অসম লড়াইয়ের ছবি।
“অর্ধেকেরও কম গাছে গুটি এসেছে। ওষুধ প্রয়োগ করেও অনেক গুটি ঝরে যাচ্ছে। এখন সবকিছুই নির্ভর করছে প্রকৃতির ওপর,”—তার কণ্ঠে ভেসে ওঠে সময়ের ভার।
তবে মাঠের এই উদ্বেগের মাঝেও কৃষি বিভাগ রাখছে আশার আলো।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এ.এস.এম হানিফ জানান, “প্রায় ২৫০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ গাছে গুটি রয়েছে। আমরা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে গুটি সংরক্ষণ করা যায়। উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ায় বাজারে দামের সম্ভাবনা বেশি।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার বলেন, “১২টি ইউনিয়নে ২,৫৫৮ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। শুরুতে মুকুল ভালো থাকলেও ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে। তারপরও ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গাছে গুটি রয়েছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি, যাতে কৃষকরা ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেন। দিনাজপুরের লিচুকে ঘিরে অর্থনীতি আরও গতিশীল করার লক্ষ্যেও কাজ চলছে।”
জেলার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মোঃ আনিছুজ্জামান (শস্য) বলেন, “জেলায় ৫,৮৭০ হেক্টর জমিতে ৫,৪১৮টি বাগানে লিচুর আবাদ হয়েছে। বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ গাছে গুটি রয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৬ থেকে ৮ মেট্রিক টন উৎপাদনের আশা করছি। উন্নত ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানির সুযোগ বাড়লে কৃষকরা আরও লাভবান হবেন।”
কিন্তু অর্থনীতির এই প্রবাহে একটি বড় বাধা—বাজারের অবকাঠামো।
জেলা কাঁচামাল আড়তদার সমিতির নেতা মিন্টু মিয়া বলেন, “দিনাজপুরে প্রতিবছর ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হয়। কিন্তু বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। আধুনিক মার্কেট না থাকায় অনেক সময় কম দামে লিচু বিক্রি করতে হয়।”
শেষ দৃশ্য
প্রকৃতির সাথে মানুষের এই সহাবস্থানের গল্পে কখনো গুটি কমে, কখনো ফলন বাড়ে—
তবু থেমে থাকে না দিনাজপুরের লিচু অর্থনীতি।
কারণ এখানে প্রতিটি লিচু কেবল একটি ফল নয়—
এটি একটি মৌসুমের স্বপ্ন, একটি অঞ্চলের স্পন্দন,
আর হাজারো মানুষের জীবনের মিষ্টি সমীকরণ।