Pallibarta.com | হাসপাতালের ১০গুন রোগী বাড়িতে।

রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১

হাসপাতালের ১০গুন রোগী বাড়িতে।

হাসপাতালে ভর্তি থাকা করোনা রোগীর চেয়ে ১০ গুণ বেশি রোগী বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে। এই তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের।

গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলেছে, এ পর্যন্ত বাড়িতে ৫৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহে মারা গেছেন ১০৫ জন।

বাড়িতে থাকার রোগীর চিকিৎসা ও সেবার বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন কোনো নজরদারি নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এরা সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি হয়ে আছে।

মহামারির শুরু দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছিল, করোনায় আক্রান্তদের ৮০ শতাংশের রোগীর লক্ষণ মৃদু বা মাঝারি থাকে। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তির দরকার হয় না। ১৫ শতাংশের উপসর্গ তীব্র হয়, তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। বাকি ৫ শতাংশের অবস্থা জটিল হয়। তাঁদেরও হাসপাতাল সেবার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ করোনায় আক্রান্তদের ২০ শতাংশের হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন প্রথম আলোকে বলেন, এখন হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারে কিছু পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ১৫ শতাংশ রোগীর হাসপাতাল সেবার প্রয়োজন হয়। এদের মধ্যে ৩ শতাংশের পরিস্থিতি জটিল হয়। এদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সহায়তার দরকার।

অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শনাক্ত হওয়া রোগীর ১০ শতাংশ এখন হাসপাতালে ভর্তি আছে। অর্থাৎ প্রয়োজন থাকলেও বাকি ৫ শতাংশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে না বা হতে পারছে না।

কোথায় কত রোগী

গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এ পর্যন্ত ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৪৮৪ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১০ লাখ ৭৮ হাজার ২১২ জন এবং মারা গেছেন ২০ হাজার ৬৮৫ জন।

গতকাল সারা দেশের সরকারি–বেসরকারি হাসপাতালে সাধারণ শয্যা, আইসিইউ ও এইচডিইউতে রোগী ভর্তি ছিলেন ১৩ হাজার ২৫১ জন।

শনাক্ত হওয়া, সুস্থ হওয়া, মারা যাওয়া এবং ভর্তি থাকা রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, করোনা শনাক্ত হওয়ার পরও ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৩৬ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হননি। তাঁরা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এই সংখ্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর চেয়ে ১০ গুণ বেশি।

বাড়িতে যেভাবে চিকিৎসা

রাজধানীর ধানমন্ডির একটি পরিবারে চারজন করোনায় আক্রান্ত। স্বামী–স্ত্রীর বয়স যথাক্রমে ৭০ ও ৬২ বছর। তাঁদের ছেলের স্ত্রীর বয়স ২৮ বছর। তাঁদের নাতির বয়স ১৬ মাস। তাঁদের ছেলে থাকেন বিদেশে।

তাঁদের একজন আত্মীয় চিকিৎসক। ওই চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁরা কেউ হাসপাতালে যাননি। মুঠোফোনে চিকিৎসক পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও ওষুধ ব্যবহারের নির্দেশনা দিচ্ছেন।

কিন্তু দেশে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবার এ সুযোগ নেই। যাঁদের পরিচিত চিকিৎসক নেই তাঁদের একটি বড় অংশ চিকিৎসা নিচ্ছেন মুঠোফোনের মাধ্যমে। তাঁরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কল সেন্টার স্বাস্থ্য বাতায়ন (১৬২৬৩), সরকারি কল সেন্টার (৩৩৩) এবং আইইডিসিআরে (১০৬৫৫) যোগাযোগ করে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই তিনটি কল সেন্টারে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৩৬ হাজার ৭৮৮টি কল এসেছিল। স্বাস্থ্য বাতায়ন পরিচালনার দায়িত্ব থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিনোসিস হেলথের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ  বলেন, ‘৯৫ শতাংশের বেশি কল আসছে আক্রান্ত ব্যক্তি বা করোনার উপসর্গ আছে এমন ব্যক্তির কাছ থেকে। এসব কলে মূলত চিকিৎসার পরামর্শ চাওয়া হচ্ছে। বাকি কলগুলো টিকা সম্পর্কে বা কোন হাসপাতালে শয্যা পাওয়া যাবে বা অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাবে কি না, সেই সম্পর্কে।’

টেলিমেডিসিন বা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা বেড়েছে করোনাকালে। এটি বিকল্প চিকিৎসাব্যবস্থা। সরাসরি রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ বা মূল্যায়নের যে সুযোগ থাকে টেলিমেডিসিনের ক্ষেত্রে এর কিছু কমতি থাকে। তারপরও অনেক মানুষ এই সুযোগ নিতে পারেন না। তাঁরা জানেন না কোথায় ফোন করতে হবে। মহামারির শুরুর দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নম্বরগুলো গণমাধ্যমে দিয়ে দেওয়া হতো। অনেক গণমাধ্যম নিজ উদ্যোগেও সেসব নম্বর প্রচার করত। সম্প্রতি সেগুলো আর চোখে পড়ছে না।

ঝুঁকি কেন

চিকিৎসকেরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। অক্সিজেন কমে গেলে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। বেশি কমে গেলে জীবনের ঝুঁকি বাড়ে।

এই পরিস্থিতি যেন না হয় সে জন্য নিয়মিত অক্সিজেন পরিমাপ করার প্রয়োজন হয়। অনেকেই বাড়িতে অক্সিজেন পরিমাপক যন্ত্র বা অক্সিমিটার রাখেন। এর ব্যবহার সহজ। তারপরও এই যন্ত্র সম্পর্কে অনেকে জানেন না, অনেকের কেনার সামর্থ্য নেই।

বাড়িতে থাকা রোগীরা শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসেন বিভাগের অধ্যাপক রুবিনা ইয়াসমিন গত সপ্তাহে গণমাধ্যমে বলেন, ‘অক্সিজেন পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পরই অনেকে হাসপাতালে আসছেন। ২৫ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে।’ করোনায় ২০০ মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করে তাঁরা এই তথ্য পেয়েছেন।

হাসপাতালে শয্যা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। অন্যদিকে করোনা উপসর্গ নিয়ে অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বাড়িতে। এখনই এ ব্যাপারে নজর দেওয়ার কথা বলছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা।

করণীয়

টেলিমেডিসিন সেবা ছাড়া বাড়িতে থাকা রোগীদের পর্যবেক্ষণ করা বা চিকিৎসা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেই। গতকাল এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গণমাধ্যমে  বলেন, ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন, আইইডিসিআর ও ৩৩৩ থেকে এদের সেবা দেওয়া হয়।’

মহামারি পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে চলেছেন, এমন অনেকেই মনে করেন বাড়িতে থাকা রোগীদের জন্য টেলিমেডিসন সেবা যথেষ্ট নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক লিয়াকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, মহামারি মোকাবিলায় জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষকে যুক্ত করতে হবে। তাঁরা বিভিন্ন বাড়িতে থাকা রোগীর খোঁজ রাখবেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন এবং ঠিক সময়ে হাসপাতালে পাঠাতে সহায়তা করবেন। অন্য দেশে এ রকম নজির আছে।

সূত্রঃ প্রথম আলো

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১