বন্যা ঠেকাতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ বানাচ্ছে চীন - Pallibarta.com

শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২

বন্যা ঠেকাতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ বানাচ্ছে চীন

বন্যা ঠেকাতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ বানাচ্ছে চীন।বুদ্ধের পা যখন পানিতে তলিয়ে যায়, লেশান তখন ঘুমাতে পারে না।’ এমন একটা কথা বলেন চীনের লেশান শহরের বাসিন্দারা

দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সিচুয়ান প্রদেশে লেশান শহরটি অবস্থিত। সেখানেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধমূর্তিটি।

লেশান শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ইয়াংসি নদীর তিনটি শাখা। কয়েক শতাব্দী আগে লেশানের বাসিন্দারা পাহাড় খোদাই করে বুদ্ধের একটি পাথরের মূর্তি তৈরি করেছিলেন।

বন্যা ঠেকাতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ বানাচ্ছে চীন

৭০ মিটার উচ্চতার প্রাচীন বুদ্ধমূর্তিটি খরস্রোতা নদীর পাশে এত দিন ভালোই ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের আগস্টে বিশাল আকৃতির বুদ্ধমূর্তিটির পা পানিতে তলিয়ে যায়। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি চীনের ক্ষমতায় আসার পর এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।

গত বছর শহরটি ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে। বন্যায় লেশানের হাজারো বাসিন্দা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লেশানে এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে শুধু নদীই দায়ী নয়, শহরটি যেভাবে গড়ে উঠেছে, তারও দায় রয়েছে।

নগর-পরিকল্পনাবিদেরা শহরটি থেকে বন্যার পানিনিষ্কাশনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

চার দশকের অপরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে চীনের অন্য অনেক শহরও একই সমস্যার মুখোমুখি। অতিবৃষ্টির ফলে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে শহরগুলোর প্রস্তুতি খুবই দুর্বল।

বন্যা ঠেকাতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ বানাচ্ছে চীন

গত জুলাইয়ে দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় হেনান প্রদেশের রাজধানী ঝেংঝুতে ঝড় আঘাত হানে। সেখানে এক বছরের সমান বৃষ্টিপাত হয় মাত্র তিন দিনে। অতিবৃষ্টি থেকে সৃষ্ট বন্যার পানিতে গাড়ি পর্যন্ত ভেসে যায়। এই ঘটনায় প্রায় ৩০০ জন প্রাণ হারান।

চীনা গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বন্যায় বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।

১৯৫০ সালে চীনে প্রতি ১০ জনে একজন শহরে বাস করত। এখন এই সংখ্যা প্রতি ১০ জনে ছয়জন দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ শহর প্লাবনভূমিতে অবস্থিত।

পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থপতি ইউ কংজিয়ান বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত নির্মাণযজ্ঞ চালিয়েছি। আমরা ভুলভাবে এটা করেছি।’

বন্যা ঠেকাতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ বানাচ্ছে চীন

চীনে বন্যা ঠেকাতে ‘স্পঞ্জ সিটি’ গড়ে তোলার জন্য যেসব ব্যক্তি প্রথম আহ্বান জানান, তাঁদের একজন কংজিয়ান। স্পঞ্জ সিটি হলো এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে শহরগুলো বৃষ্টির পানি শুষে নিয়ে বন্যা প্রতিরোধ করবে। কংজিয়ান চীনের পুরোনো সেচব্যবস্থা থেকে এই কৌশল তৈরির প্রেরণা পান।

কংজিয়ানের হিসাবমতে, নগরায়ণের ফলে এক-তৃতীয়াংশ মাছ চাষের পুকুর ও অর্ধেক জলাভূমি বিলীন হয়ে গেছে।

স্পঞ্জ সিটি ধারণাটিকে আমলে নিয়ে পরিকল্পনায় অঙ্গীভূত করে চীন সরকার। এ বিষয়ে ২০১৫ সালে দেশটির সরকার কয়েক দফা নির্দেশনাও দেয়।

২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ শহর ৭০ শতাংশ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করবে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব লক্ষ্য ঠিক করে।

২০১৮ সালে ঝেংঝু শহর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয় যে তারা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ ভাগের ৯ ভাগ মূল শহর এলাকা স্পঞ্জ সিটির আওতায় আনবে।

চলতি বছর লেশান শহর কর্তৃপক্ষও ঘোষণা দিয়েছে যে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ নগর এলাকাকে তারা সরকার নির্ধারিত স্পঞ্জ সিটির মানদণ্ডের আওতায় নিয়ে আসবে।

চীনের শহরগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্যা প্রতিরোধে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজে ভারী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে তারা। কিন্তু তার ফল আশানুরূপ নয়। ‘স্পঞ্জ ইফেক্ট’ তৈরির জন্য কৃত্রিম জলাভূমি তৈরিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ দরকার।

তবে ঝেংঝুর বন্যা গোটা দেশকেই হতবাক করে দিয়েছিল। এই বন্যা দেখে চীনের অনেকের মনে স্পঞ্জ সিটির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

তবে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে একমত যে ঝেংঝুতে স্পঞ্জ সিটি প্রকল্পের কার্যকারিতা অপ্রমাণিত হয়নি। কারণ, প্রকল্পটি বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে, সে অবস্থায় তার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করাটা ঠিক হবে না। তাঁদের মতে, ২০৩০ সালের আগে ঝেংঝুর স্পঞ্জ সিটি প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা কঠিন হতে পারে।

বেইজিংয়ের চায়না অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির কং ফেং বলেন, বন্যার পানি সংগ্রহ করার জন্য আরও ভূগর্ভস্থ স্থানের প্রয়োজন। গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ভূগর্ভে যে স্থানগুলো রয়েছে, তার মধ্যে সর্বশেষ পর্যায়টি জরুরি পরিস্থিতিতে পানি ধারণের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

কিন্তু এই ধরনের বিকল্প ব্যবস্থার এখনই দরকার পড়বে না বলে মত কং ফেংয়ের। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একবার এটি ব্যবহার করা হলে তা শহরের জন্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করবে।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারগুলো স্পঞ্জ সিটি তৈরির জন্য বরাদ্দ পাওয়া অর্থ ভুল কাজে ব্যয় করে থাকে। প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা তৈরিতে ব্যয়বহুল কোনো জায়গা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে প্রায়ই অনাগ্রহ দেখা যায়।

একটি কার্যকর স্পঞ্জ সিটি গড়ে তোলার জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্পঞ্জ সিটি যে কাজ দিচ্ছে, তার প্রমাণ দেশটির অন্যান্য স্থানে পাওয়া যাচ্ছে। ঝেংঝুর মতো উহান একটি বন্যাপ্রবণ শহর। এটিও ইয়াংসি নদী-তীরবর্তী শহর। স্পঞ্জ সিটির পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে শহরটিকে বেছে নেওয়া হয়। গত বছরের ৫ থেকে ৬ জুলাই উহানে রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টি থেকে সৃষ্ট বন্যার পানি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সরে যেতে শুরু হয়। এমনকি পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়।

কং ফেং বলেন, ঝেংঝুর বন্যার পানির স্তর আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে কমেছে। অনেক সমালোচক অবশ্য এই সত্যকে উপেক্ষা করেন। তুলনামূলক দ্রুতগতিতে পানি কমার ক্ষেত্রে শহরে গৃহীত বন্যা প্রতিরোধের পদক্ষেপ সাহায্য করেছিল। এসব পদক্ষেপের মধ্যে ছিল ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ পয়োনালা নির্মাণ বা সংস্কারকাজ।

ঝেংঝুর পানি শোষণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার জন্য শহরের কর্মকর্তারা সম্প্রতি স্থপতি ইউ কংজিয়ান ও তাঁর দলের কাছে সহায়তা চেয়েছেন।

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০৩১