Pallibarta.com | পবিত্র ভূমিতে পাপাচার।

সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

পবিত্র ভূমিতে পাপাচার।

শেষ সম্বল বিক্রি করে তারা পাড়ি জমান মরুর দেশ সৌদি আরবে। দুরুদুরু বুকে বিদেশ যাত্রার সময় বাংলাদেশি নারীদের মনে দানা বাঁধে সৌদি নিয়োগকর্তার লিপ্সার শিকার হওয়ার ভয়। কিন্তু স্বদেশির যৌনলিপ্সার শিকার হচ্ছেন তারা। তাও খোদ দূতাবাসের ভেতরেই। যে দূতাবাস সার্বভৌমত্বের প্রতীক, বিদেশ-বিভুঁইয়ে এক টুকরো বাংলাদেশ সেখানেই তারা সম্ভ্রম হারিয়ে দেশে ফিরছেন।

একজন বা দুজন নয়, একাধিক নারী একই কর্মকর্তার কাছে যৌননিগ্রহের শিকার হয়েছেন। ৯ জন নারী তাদের দুর্দশার কথা তদন্তদলের কাছে তুলে ধরেছেন। তাদের বাইরেও আরও নারী থাকতে পারেন, যারা তার হাত থেকে রেহাই পাননি। এমনটাই মনে করছেন জনপ্রশাসন ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা, যারা এ ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠাতে বাংলাদেশে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা রয়েছে। দেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ধারা অব্যাহত রাখতে এসব প্রচারণা আমলে না নিয়ে সরকার দেশটিতে নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠাচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের কর্মকর্তাদের উচিত ছিল বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা। কিন্তু উল্টো রক্ষকই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

এই ভক্ষকের নাম মো. মেহেদী হাসান। প্রশাসন ক্যাডারের এই কর্মকর্তা বর্তমানে উপসচিব। সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সিলর (শ্রম) পদে নিয়োগ পান ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকরা সমস্যায় পড়লেই দূতাবাসের কাউন্সিলরের (শ্রম) কাছে ছুটে যান। তাদের কাছে এই পদের কর্মকর্তা লেবার কাউন্সিলর হিসেবেই পরিচিত। সৌদি আরবের রিয়াদও এর ব্যতিক্রম নয়। নারী গৃহকর্মীরা বিপদে পড়লেই আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে যান দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলরের কাছে। কারণ তার তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয় সেইফহোম। যাদের থাকার কোনো জায়গা নেই, তারা সেইফহোমে আশ্রয় নেন। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগান মেহেদী হাসান।

দূতাবাসে আশ্রয়ের সন্ধানে যাওয়া অল্পবয়সী গৃহকর্মীদের টার্গেট করতেন তিনি। তাড়াতাড়ি দেশে ফেরত পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে তাদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতেন। যারা রাজি হতেন না তাদের সেইফহোমে রেখেই রাজি করানোর চেষ্টা করতেন। বিভিন্ন উপলক্ষে উপহারসামগ্রী পাঠাতেন। তারপরও সম্পর্ক স্থাপনে রাজি না হলে জোর করতেন। এসব কাজের জন্য তিনি অফিস-পরবর্তী সময় বেছে নিতেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য তিনি বিকেল ৫টার পর আশ্রয়ের সন্ধানে যাওয়া নারীদের ডেকে পাঠাতেন। দূতাবাসের থার্ড লেবেলের কর্মকর্তা হয়েও তিনি নিজস্ব একটা নিয়মকানুন তৈরি করেছিলেন। একমাত্র তার অনুমতি ছাড়া কোনো গৃহকর্মী বাংলাদেশে ফিরতে পারবে না এ ধারণার জন্ম দিয়ে ভীতিসঞ্চার করতেন। তিনি যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য অপ্রয়োজনীয় সাক্ষাৎকার প্রথা চালু করেন। তার এসব অনিয়ম প্রমাণ করতে না পারলে চাকরি হারাবেন এ ভয়ে অধীনস্থ কর্মচারীরাও চুপ থাকতেন। কিন্তু তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায় এক গৃহকর্মীর সাহসে।

ওই গৃহকর্মী তার ধর্ষণের কাহিনী ফাঁস করে দেওয়ার পর তদন্তে নামে দূতাবাস প্রশাসন। রাষ্ট্রদূত ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর কড়া নির্দেশনায় যে রাতে ওই নারী ধর্ষণের শিকার হন সে রাতেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন তদন্তকারীরা। নিপীড়নের শিকার অন্য নারীদের জবানবন্দিও নেন তারা। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৬ জানুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠান তদন্তকারীরা। পরে অভিযুক্ত মেহেদী হাসান ছাড়াও অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবানবন্দি নিয়ে গত ২৬ জানুয়ারি তারা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান ঢাকায়। তদন্ত করেছেন বাংলাদেশ দূতাবাস রিয়াদের মিনিস্টার ও কার্যালয় প্রধান ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ এবং দূতাবাসের ডিফেন্স অ্যাটাশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাঈদ সিদ্দিকী। তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত পোষণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন রাষ্ট্রদূত ড. জাবেদ পাটোয়ারী।

পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মেহেদী হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিভাগীয় মামলা চালু করে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবু আহমদ সিদ্দীকীকে। তিনি অভিযোগ দায়েরকারী প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং অভিযুক্ত মেহেদী হাসানকে তলব করেছিলেন গত ২৭ জুলাই।

জানতে চাইলে আবু আহমদ সিদ্দীকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু করোনা মহামারীর কারণে স্বাভাবিক কাজ করতে বিলম্ব হচ্ছে।’ এদিকে মো. মেহেদী হাসান গতকাল মঙ্গলবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৌদি আরবে যা হয়েছে তা আমার বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র। এ বিষয় নিয়ে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।’

দূতবাসের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলিত বছর ১৩ জানুয়ারি সৌদি আরব সময় রাত সাড়ে ৯টায় রাষ্ট্রদূত জানতে পারেন একজন কর্মকর্তা সেইফহোমের গৃহকর্মীকে দূতাবাসে যৌন নির্যাতন করেছেন। তিনি দুজন কর্মকর্তাকে বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। রাত সাড়ে ১০টায় অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়। প্রথম দফার তদন্তে ধর্ষণের শিকার অভিযোগকারী ছাড়াও আরও পাঁচজন গৃহকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করা হয়। তারা প্রত্যেকেই বলেছেন, তারা দূতাবাসের ভেতরে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

নিপীড়নের শিকার নারীরা তদন্তদলের সামনে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তার ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ওই নারীদের নাম উল্লেখ করা হয়নি নীতিগত কারণেই।

ধর্ষণের শিকার গৃহকর্মী গত বছরের ৮ ডিসেম্বর আশ্রয়ের জন্য রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। তিনিসহ চারজন দূতাবাসে গৃহকর্মীদের অপেক্ষমাণ কক্ষে সেদিন বসেছিলেন। বিকেল ৫টার পর মেহেদী হাসান তাদের সাক্ষাৎকার নেন। একে একে তিনজনের সাক্ষাৎকার শেষে তাদের বের করে দিয়ে চতুর্থ জনের সঙ্গে একান্তে আলাপ শুরু করেন তিনি। ওই গৃহকর্মী দুই বছর চার মাস আগে সৌদি আরব গেছেন। দুই বছরের চুক্তি ছিল, যা শেষ হওয়ার পরও কফিল (নিয়োগকর্তা) তাকে দেশে ফিরতে দিচ্ছেন না। তাই দেশে ফেরার ব্যবস্থা করার জন্য দূতাবাসে যান তিনি। সাক্ষাৎকারের সময় মেহেদী গৃহকর্মীর কাছে জানতে চান, ‘দেশে যেতে টাকা লাগবে, আছে?’ জবাবে গৃহকর্মী জানান, তার কাছে টাকা নেই। তখন মেহেদী বলেন, একটা সুযোগ আছে। তার সঙ্গে মেলামেশা করতে হবে। এ প্রস্তাব শুনে ওই গৃহকর্মী বের হয়ে যান। কয়েক দিন পর তাকে পুনরায় মেহেদী হাসানের অফিস কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। ওইদিনও মেহেদী হাসান তাকে জোরাজুরি করেন।

গত ১৪ জানুয়ারি ফ্লাইটের ডেট থাকায় ১৩ জানুয়ারি ওই গৃহকর্মীর করোনা টেস্ট হয়। করোনা টেস্টের পর পাঁচজনকে সন্ধ্যা ৬টায় মেহেদী হাসানের অফিস কক্ষে নেওয়া হয়। অপর চারজনের সঙ্গে কথা বলে তিনি তাদের বিদায় করে দেন। ফ্লাইটে ওঠার আগের রাতে ওই গৃহকর্মীকে জোর করে যৌন নির্যাতন করেন মেহেদী হাসান। ঘটনার পর দূতাবাস থেকে সেইফহোমে যাওয়ার জন্য দূতাবাস নির্ধারিত গাড়িতে উঠেই গাড়িচালক জানে আলমকে ধর্ষণের কথা জানান নির্যাতিতা নারী।

একই দিনে তদন্তদলকে অপর গৃহকর্মী জানান, মেহেদী হাসান তার মোবাইলের পাসওয়ার্ড খুলে দিতে বলেন। এসময় মেহেদী ওই গৃহকর্মী ও তার স্বামীর একান্ত ব্যক্তিগত ছবি দেখেন। দীর্ঘ সময় নিয়ে তিনি ছবিগুলো জুম করে দেখেন। একপর্যায়ে মেহেদীর কথামতো কাজ করতে বাধ্য হন গৃহকর্মী।

তৃতীয় গৃহকর্মী জানান, তাকে রুমে ডাকা হয়। ভেতরে যাওয়ার পরই তার ফোন নেওয়া হয়। একইসঙ্গে জানতে চান, কফিল বা অন্য কেউ ধর্ষণ করেছে কি না। মেহেদী তাকে তার বুক দেখাতে বলেন।

উল্লেখিত তিনজনের বক্তব্য শোনার পর তদন্তকারীদের ধারণা হয়, মেহেদী দূতাবাসে যাওয়া প্রায় সবার সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করেছেন। এ কারণে ওই দিন ১১ জানুয়ারি সাক্ষাৎদানকারী সব গৃহকর্মীকে ডেকে পাঠায় তদন্তদল।

তদন্তকারীদের এক গৃহকর্মী জানান, মেহেদী তার পেট দেখতে চাইলে তিনি পেট দেখান। অপরজন জানান, তিনি পেট দেখাননি। জয়পুরহাটের ৪৫ বছর বয়সী সেলিনা বেগম জানান, অপেক্ষাকৃত বেশি বয়স হওয়ার কারণে মেহেদী তার সঙ্গে কোনো বাজে আচরণ করেননি।

শ্রম উইংয়ের গাড়িচালক জানে আলম জবানবন্দিতে জানান, তিনি ২০১৯ সাল থেকে দূতাবাসের গাড়িচালক পদে কর্মরত। তার স্ত্রী তানজিলা খাতুন একই সময় থেকে সেইফহোমের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করছেন। গৃহকর্মীদের সেইফহোমে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে দূতাবাসে অপেক্ষা করতে থাকেন। সন্ধ্যা ৭টায় ৫ গৃহকর্মী দূতাবাস থেকে বের হয়ে গাড়িতে ওঠেন। নির্যাতিত নারী গাড়িতে উঠেই চিৎকার করে জানান, মেহেদী হাসান তার ক্ষতি করেছে। তিনি তাকে থামিয়ে বলেন, যা বলার সেইফহোমে গিয়ে বলতে। সেইফহোমে গিয়ে জানে আলম হোমের আইন সহায়তাকারী রাফিউল বারীকে টেলিফোন করেন। রাফিউল তাকে বিস্তারিত শোনার পরামর্শ দেন। এরপর জানে আলম তার স্ত্রী তানজিলাকে বিস্তারিত শুনতে বলেন। সব শুনে তানজিলা জানান, মেহেদী হাসান ওই গৃহকর্মীকে ধর্ষণ করেছেন।

জানে আলম আরও জানান, মেহেদী হাসান বিকেল ৫টার পর গৃহকর্মীদের সাক্ষাৎকার শুরু করেন। শেষ হতে হতে সাড়ে ৭টা বেজে যায়। কোনো দিন ৮টাও বেজে যায়। এটা নির্ভর করে গৃহকর্মীদের বয়সের ওপর। যেদিন অল্পবয়সী গৃহকর্মী থাকে সেদিন বেশি সময় নেন। বয়সী গৃহকর্মীদের কম সময়ে ছেড়ে দেন তিনি। সেইফহোমে আশ্রয় দেওয়ার আগে তিনি সব গৃহকর্মীর সাক্ষাৎকার নিতেন। বাংলাদেশে চলে যাওয়ার আগের দিন তিনি কোনো কোনো গৃহকর্মীর দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎকার নিতেন। কোনো কোনো গৃহকর্মীকে অন্যান্য সময়েও কোনো কারণ ছাড়াই দূতাবাসে আনতে বলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সময় গৃহকর্মীদের উপহার পাঠিয়েছেন। উপহারের মধ্যে ছিল অন্তর্বাস, রেজার, সাবান ও শ্যাম্পু।

শ্রমকল্যাণ উইংয়ের আইন সহায়তাকারী রাফিউল আলম তার জবানবন্দিতে জানান, সেইফহোমের ড্রাইভার জানে আলম তাকে ১৩ জানুয়ারি জানায় মেহেদী হাসান একটি মেয়েকে ধর্ষণ করেছেন। তিনি শুনে ভয় পেয়ে যান এবং দূতাবাসের অপর আইন সহায়তাকারী সোহেল আহমেদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সোহেল আহমেদ দূতাবাসের কূটনৈতিক উইংয়ের কাউন্সিলর মো. হুমায়ুন কবীরকে বিষয়টি জানান। ঘটনার আকস্মিকতা ও সংবেদনশীলতার কথা চিন্তা করে তিনি রাত সাড়ে ৯টায় রাষ্ট্রদূতকে বিষয়টি অবহিত করেন।

রাত ১২টা ৪০ মিনিটে মেহেদী হাসানের অফিস কক্ষ ও অফিস কক্ষসংযুক্ত (অ্যাটাচড) টয়লেট পরিদর্শন করেন তদন্তকারীরা। টয়লেটে ধর্ষণের জন্য যথেষ্ট জায়গা রয়েছে বলে তদন্তকারীদের কাছে মনে হয়েছে। এছাড়া মেহেদী হাসানের কক্ষের সামনের ১০, ১১ ও ১৩ জানুয়ারির সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রতিদিনের ফুটেজেই প্রমাণ হয়েছে, প্রতিদিনই নির্দিষ্ট করে একজন গৃহকর্মী দীর্ঘ সময় মেহেদী হাসানের কক্ষে অবস্থান করত।

মেহেদী হাসানের জবানবন্দি : ১৩ জানুয়ারি ঘটনার পরপরই মেহেদী হাসান সৌদি আরবেরই অন্যপ্রান্তে সফরে চলে যান। পরদিন ১৪ জানুয়ারি বিকেল ৪টা ২৪ মিনিটে মোবাইল ফোনে অভিযোগের বিষয়ে অবগত করে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি তদন্তকারীদের বলেন, ‘এটা উদ্ভট ও ফেব্রিকেটেড।’ সফর শেষে ১৭ জানুয়ারি দূতাবাসে ফিরে এলে বেলা ১১টায় দূতাবাসের লাইব্রেরিতে তার জবানবন্দি নেওয়া হয়। প্রথমেই তাকে অভিযোগের বিষয়ে মৌখিকভাবে অবগত করা হয়। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং তার মতো করে একটি বর্ণনা দেন।

এরপর মেহেদী হাসানকে প্রথম অভিযুক্তের বক্তব্যের ভিডিও দেখানো হয়। একই ধরনের অভিযোগে আরও গৃহকর্মীর জবানবন্দির ভিডিও রয়েছে জানানো হলেও তিনি সেগুলো আর দেখতে চাননি। তিনি যে বিকেল ৫টার পর একাকী গৃহকর্মীদের দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষাৎকার নিতেন সেটা সিসিটিভির ফুটেজে প্রমাণ হওয়ার কথা জানানো হয়। গৃহকর্মীদের যৌন নির্যাতনের বিষয়ে তিনি লিখিত জবানবন্দি দেন। পরে তাকে জেরা করা হয়।

লিখিত জবানবন্দিতে মেহেদী বলেন, ‘(প্রথম অভিযুক্ত) প্রথম যেদিন আশ্রয়ের জন্য দূতাবাসে আসে সেদিন তার সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে তাকে আমার অর্গানাইজড প্রস্টিটিউট গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে সন্দেহ হয়। তাকে জেরার একপর্যায়ে সে আমাকে ভয় দেখাতে শুরু করে। সে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করার হুমকি দেয়। আমি তার বক্তব্য মোবাইলে রেকর্ড করার চেষ্টা করলে সে আমার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। এতে ক্রোধান্বিত হয়ে আমি হিট অব দি মোমেন্টে তাকে চড় মারি। সে কাঁদতে থাকে। একপর্যায়ে সে টয়লেটে যায়।’

মেহেদী তদন্তকারীদের জানান, পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটি থাকলে তার অজ্ঞাতসারেই হয়েছে। এজন্য তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার অঙ্গীকারও করেন তিনি।

ঘটনার ৫ দিন পর সেইফহোম থেকে দূতাবাসে গিয়ে চার গৃহকর্মী স্বেচ্ছায় মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে একজন জানান, তাকে ধর্ষণের সময় মেহেদী কোনো জন্মনিরোধকসামগ্রী ব্যবহার করেননি। তিনি ভয় পাচ্ছেন সন্তান হলে দেশে গিয়ে তিনি কীভাবে মুখ দেখাবেন। অপর একজন জানিয়েছেন, তার উপস্থিতিতেই মেহেদী তার ছোট বোনের গায়ে হাত দিয়েছেন। এসব বিষয়ে মেহেদী কোনো প্রমাণ বা ভিডিওতে অভিযোগকারীদের বক্তব্য শুনতে বা দেখতে চাননি।

তদন্ত কমিটির বিশ্লেষণ : ১৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ১৯ মিনিট থেকে ৭টা ৫ মিনিট পর্যন্ত মেহেদীর কক্ষে ছিলেন প্রথম অভিযোগকারী। মেহেদী প্রথম অভিযোগকারীর সঙ্গে ১০ থেকে ১২ মিনিটের সাক্ষাৎকারের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘ ৪৬ মিনিট তার সঙ্গে কথা বলার বা অবস্থানের প্রমাণ সিসিটিভিতে রয়েছে।

তদন্ত কমিটির কাছে প্রথম অভিযোগকারী জোর দিয়ে বলেছেন, মেহেদী তাকে টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করেছেন। টয়লেটে এত জায়গা আছে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে অভিযোগকারী জোর দিয়ে বলেন, টয়লেটে পর্যাপ্ত জায়গা আছে। সেখানেই তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ধর্ষণের প্রমাণের জন্য প্রয়োজনে তিনি ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে চেয়েছিলেন। পরে তদন্তকারীরা টয়লেট পরিদর্শন করেন।

ধর্ষণের ঘটনার পর মেহেদী সফরে চলে যান। সেখানেই তাকে ধর্ষণের বিষয়টি জানানো হয়। অভিযোগটি মিথ্যা হলে তিনি সফর শেষ না করেই ফিরে আসতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। সফর শেষ করেই তিনি ফিরেছেন। তিনি ধর্ষণের অভিযোগ থেকে বাঁচার জন্য অভিযোগকারীকে চড় দেওয়ার গল্প ফেঁদেছেন। তিনি ভেবেছিলেন চড় দেওয়ার গল্প শুনিয়ে সহজেই বিষয়টি উড়িয়ে দেবেন। তাছাড়া অভিযোগকারীর ক্ষিপ্ত হয়ে ভয়ভীতি দেখানো শুরু করার বিষয়টিও সত্য নয়। কারণ একজন গৃহকর্মীর পক্ষে একজন কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখানো বাস্তবসম্মত না।

প্রথম অভিযোগকারী ভুল টার্গেট ছিল : দূতাবাসে মেয়েরা প্রথম যেদিন আসেন, সেদিন তাদের অশ্লীল প্রশ্ন করে কোন মেয়ে তার সঙ্গে মেলামেশা করবে এটা বোঝার চেষ্টা করেন মেহেদী হাসান। তাদের তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে পাঠানোর কথা বলে মেলামেশার প্রস্তাব দিতেন। একান্ত মেয়েলি উপহারসামগ্রী পাঠাতেন তাদের। প্রথম অভিযোগকারীও তার টার্গেট ছিল। তাকেও তাড়াতাড়ি দেশে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি রাজি হননি। অন্য গৃহকর্মীদের চেয়ে তিনি ‘সুন্দরী’ হওয়ায় মেহেদী তাকে রাজি করাতে না পেরে ধর্ষণ করেন। মেহেদী বুঝতে পারেননি যে, অভিযোগকারী সেটা প্রকাশ করে দেবেন; যা অন্য কেউ প্রকাশ করেননি। অর্থাৎ প্রথম অভিযোগকারী মেহেদীর ভুল টার্গেট ছিল।

ঘটনার পরম্পরায় মেহেদীর কাছে প্রথম অভিযোগকারীর ধর্ষিত হওয়ার সত্যতা রয়েছে বলে কমিটির বিশ্লেষণে প্রকাশ করা হয়।

চারজন কর্মী যখন স্বেচ্ছায় দূতাবাসে এসে তাদের ওপর চালানো যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করে দেয়, তখন মেহেদীকে তাদের মুখোমুখি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। মেহেদী সেই সুযোগ নিতে চাননি। তদন্ত কমিটি মতামতে বলেছে, মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগকারীর আনা ধর্ষণের অভিযোগ সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

একমাত্র তার অনুমতি ছাড়া কোনো গৃহকর্মী বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন না এ ধারণার জন্ম দিয়ে ভীতিসঞ্চার করতেন মেহেদী হাসান। গৃহকর্মীদের ভয় দেখিয়ে, গণহারে অশ্লীল প্রশ্ন করে যৌন নির্যাতন করতেন এবং ধর্ষণের টার্গেট নির্ধারণ করতেন। এসব প্রমাণিত হয়েছে। অশ্লীল প্রশ্ন করা এবং অশালীন আচরণ করা মেহেদীর বিকৃত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মেহেদী তার যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য একান্তে সাক্ষাৎকার নিতেন। মেহেদী শ্রমকল্যাণ উইংয়ের কর্মচারীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করেছিলেন। চাকরি হারানোর ভয়ে কর্মচারীরা বিষয়টি কর্র্তৃপক্ষকে জানাননি

সুপারিশ : ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা অনুযায়ী, মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই গুরুতর। মেহেদীর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গুরুদণ্ড আরোপ করার সুপারিশ করা হয়। মেহেদী হাসানের অপরাধের সঙ্গে দূতাবাস, প্রশাসন ও সরকারের ভাবমূর্তি জড়িত। সরকার যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে, সেখানে রক্ষকের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার এরূপ ভয়ংকর অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা যেতে পারে বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়।

সূত্রঃ দেশ রুপান্তর

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০