Pallibarta.com | টিউলিপ উৎসবে একদিন - Pallibarta.com

সোমবার, ১৬ মে ২০২২

টিউলিপ উৎসবে একদিন

টিউলিপ উৎসবে একদিন-pallibarta ছবি তুলেছেন শামীম আল আমিন/পল্লিবার্তা

দৃষ্টির সবটুকু সীমানা নিয়ে দিগন্তজুড়ে সারি সারি বর্ণিল টিউলিপ। যেনো সবুজ প্রান্তরে রঙধনু বিছিয়েছে আঁচল। মিষ্ট রোদে অযুত-নিজুত মানুষের সঙ্গে নীলাম্বর তার শাদা মেঘের দল নিয়ে এসেছে বর্ণাঢ্য টিউলিপ দেখতে। নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোর সবাই বিহ্বলতা মনোহারি রঙের মেলায়।

জায়গায় জায়গায় দাঁড় করে রাখা হয়েছে রঙ-বেরঙের ডাচ বাইসাইকেল। আছে নানা ঢঙের ছবি তোলার ফ্রেম। কাঠে বানানো বড় আকৃতির টিউলিপ ও নানান রঙের প্রজাপতি। যেখানে যেভাবেই ছবি তোলা হোক না কেনো, দেখে মনে হয় যেনো রঙিন সিনেমার কোনো সুদৃশ্য স্থিরচিত্র।

এই মুগ্ধকর দৃশ্য দেখেছি হল্যান্ড রিডজ ফার্মে। মধ্য নিউজার্সিতে নয়শত বিঘা জায়গা নিয়ে হল্যান্ডের অধিবাসীরা গড়ে তুলেছেন এই টিউলিপ সাম্রাজ্য। এবার তারা আবাদ করেছেন ৮০ লাখ টিউলিপ ফুল।

এই বিস্তৃত অঞ্চল দেখতে ট্রাক্টরের পেছনে কাঠের বগিযুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ শাটল। সবুজ শাটলটি শত মানুষ নিয়ে ধীরে চলে টিউলিপ ক্ষেতের পাশ ঘেঁষে। আগত দর্শনার্থীদের জন্য বিনা খরচে চলা এ শাটলের আছে বেশ কয়েকটি স্টেশন। নির্দিষ্ট জায়গায় আছে শৌচাগার ব্যবস্থা ও অজস্র রকমের খাবার দোকান।

ছোট একটি মিউজিয়াম আছে। তাতে দেখা যায়, টিউলিপ উৎপাদনে ব্যবহৃত সকল সরঞ্জামাদি। আছে টিউলিপের ইতিহাস ঐহিত্যের বর্ণনা। ছোট একটি চিড়িয়াখানা আছে। সেখানে আছে টিউলিপ চাষাবাদে ব্যবহৃত ঘোড়া-ভেড়া ও তাদের প্রয়োজনীয় গৃহপালিত পশু। শিশুদের জন্য আছে ঘোড়া ও ঘোড়াশাবকের পিঠে চড়ার ব্যবস্থা।

খামারের পাশেই রয়েছে ডাচ ঐতিহ্যে নির্মিত তাদের বাড়ি। বাড়ির সামনে পরিচ্ছন্ন উন্মুক্ত উঠান। চেরি ফুলসহ নানান ফুল-ফলের বড় বড় গাছের নিচেও লাগানো হয়েছে এক-দেড় ফুট উচ্চতার সব টিউলিপ গাছ। ভাস্কর্য করে রাখা হয়েছে টিউলিপ চাষে ব্যবহৃত তাদের পূর্বপুরুষের কাঠের হলুদ জুতো।

হলুদ জুতো পায়ে দিয়ে ছবি তোলার ও ব্যবস্থা আছে। মাঠ থেকে ফুল তুলে এনে দিলে তারা সুন্দর করে প্যাকেট করে দেয়। তার জন্য ফুল প্রতি গুনতে হয় এক ডলার। অনলাইনে অর্ডার করলে আছে ডেলিভারি ব্যবস্থা। খামারে যারা কাজ করে তারা ডাচ বংশোদ্ভাত। তাদের অমায়িক আচরণে ফুটে উঠে সে দেশের সভ্যতা।

নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস থেকে ফার্মটির দূরত্ব ৭০ মাইল। গাড়িতে করে যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। বাগানে প্রবেশের পূর্বে হাজার দুয়েক গাড়ি পার্কিং এর সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা আছে তাদের। ১৩ ডলারে টিকিট কেটে বাগানে প্রবেশের সময় এক পাতার যে ব্রুসিয়ার দিয়েছে হাতে; তাতে লেখা আছে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় টিউলিপ ফার্ম। দেওয়া আছে ফার্মের যাবতীয় দিকনির্দেশনা। ফার্মটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হয় সকাল ৯টায়। বন্ধ হয় বিকেল পাঁচটায়।

‘আমেরিকান স্প্রিং’ চলছে এখন। লাল-নীল-সাদা-হলুদ-বেগুনী-পিংক-কমলা প্রকৃতির সব রঙ যেনো টিউলিপ ফুলে আছে। এক রঙেরও নানান ধরণ আছে টিউলিপে। তাই এটি একাই একটি রঙের উৎসব। মার্চ মাসের ২২ তারিখ স্পিং শুরু হলেও টিউলিপ ফোটার আগে স্প্রিং এর প্রকৃত বৈচিত্রতা পাওয়া যায় না।

এ সাপ্তাহে টিউলিপ ফুটতে শুরু করেছে। সপ্তা পাঁচেকের স্বল্প জীবন নিয়ে এ ফুল বর্ণময় করে তুলে পুরো প্রকৃতি। তাই আমেরিকাজুড়ে এখন টিউলিপ উৎসব। ভিন্ন বর্ণের টিউলিপ উপহার দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ তাদের অনুভূতি প্রকাশ করে। পশ্চিমা জনজীবনে আনন্দ বেদনা সকল উপলক্ষে টিউলিপ যেনো এক অভিচ্ছেধ্য অংশ। সুবাসহীন এ ফুল পৃথিবীব্যাপী এতো জনপ্রিয় হবে তা আর কেউ না জানলেও জানতেন অটোমান সম্রাট সুলতান।

ষোড়শ শতাব্দীর অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান তার শাসনামলে তার মনোরঞ্জনের জন্য টিউলিপ চাষাবাদ বাধ্যতামূলক করেছিলেন। তুরস্কে ১৮ শতাব্দীর প্রথম দিকে ‘টিউলিপ যুগ’ শুরু হয়েছিলো। এই অঞ্চলে টিউলিপের ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রমাণ আফগানিস্তানের জাতীয় ফুল টিউলিপ।

ইতিহাসবিদদের ধারণা, অটোমান সাম্রাজ্য পেরিয়ে ইউরোপে এই ফুল প্রবেশ করে ভিয়েনার একজন জীববিজ্ঞানীর মাধমে। মধ্য এশিয়ায় জন্ম নেওয়া এ ফুলকে ইউরোপিয়ো দেশ হল্যান্ড আপন করে তাদের জাতীয় ফুল হিসেবে বরণ করে নেয়। হল্যান্ডের বর্তমান নাম নেদারল্যান্ড। এ দেশটি এখন পৃথিবীর বুকে সর্বাধিক টিউলিপ উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশ।

পশ্চিম ইউরোপে ‘টিউলিপ’ শব্দটি প্রথম উল্লিখিত হয়েছিল ১৫৫৪ সালে বা তার কাছাকাছি সময়ে। কূটনীতিক ওগির ঘিসলিন ডি বুসবেকের ‘তুর্কি চিঠি’তে। এটি মোনলাইন.কম এর তথ্যানুযায়ী টিউলিপ শব্দটি ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করেছে ফরাসি ভাষার মাধ্যমে। যা কি না অটোমান টার্কিশ শব্দ টুব্লেন্ড থেকে প্রবেশ করেছে ফরাসী ভাষায়। আবার পার্সিয়ান শব্দ ডেব্লেন্ড (ট্যাবেন যার অর্থ পাগড়ি) থেকেও উৎপত্তি লাভ করতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

‘ফুল’ শুধু প্রেম-ভালোবাসা, পবিত্রতার প্রতীকই নয়, এটি কখনো কখনো হয়ে উঠেছে বিপ্লবেরও প্রতীক। জর্জিয়ায় ২০০৩ সালের অহিংস ‘গোলাপ বিপ্লব’, ২০০৫ সালের কিরগিস্তানের ‘টিউলিপ বিপ্লব’ এ আমরা দেখেছি ফুল গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ অন্যায় ও দুর্নীতি বিরুদ্ধে। হাজার দশেক দর্শনার্থীদের মধ্যে ফার্মে পেয়েছিলাম ইয়োগা শিল্পী ও লেখক আশরাফুন নাহার লিউজাকে।

তিনি বলেন, পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে এসেছি। প্রতি বছর এই সময়ে আমরা এখানে আসি। এখানে ভিন্ন ভিন্ন রংয়ের সুবিস্তৃত ও বিশাল জায়গাজুড়ে একসাথে এত টিউলিপ দেখে সত্যিই আমার মন জুড়িয়ে যায়। হৃদয় প্রসারিত হয়। চোখ খুলে দেখতে পারি বাধাহীন ভাবে। তারচেয়েও বড় কথা এখানে এলে আমার মন সঠিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়। ক্রিয়েটিভ ফ্লো নতুন করে প্রাণ পায়।

 

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১