Pallibarta.com | খোকা বাড়ি আসবি কবে! - Pallibarta.com

সোমবার, ১৬ মে ২০২২

খোকা বাড়ি আসবি কবে!

খোকা বাড়ি আসবি কবে!-pallibarta মাসুম হাসান জুয়েল/পল্লিবার্তা

মাসুম হাসান জুয়েল, সিঙ্গাপুর প্রবাসী

দেখতে দেখতে ১০টি বছর কেটে গেলো! জীবনের অর্ধেক সময় কাটিয়ে দিলাম দূরপরবাসে। প্রথম যখন বিদেশ আসার নাম নিই, অনেক হিসাব কষেছি। প্রায়ই মাকে বলতাম আমার জন্য দোয়া করো তোমাদের সব কষ্ট দূর করে দেবো!

বিমানের ছোট্ট জানালা দিয়ে মা’কে আরেকবার দেখার চেষ্টা করতাম, বিমান আরেকটু ওপরে উঠলে নিজের বাড়িটা খোঁজার চেষ্টা করতাম। প্রথম যখন এদেশের বিমানবন্দরে নামলাম, কাউকেই চিনতে পারিনি, ভাষাও বুঝতে পারিনি।

অপেক্ষায় ছিলাম ৬ ঘণ্টা যে ছেলেটা বাড়িতে থাকতে সময়ের কাজ সময়ে করতো, সময়ে খেত। সে দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টা না খেয়ে অপেক্ষা করছে কোম্পানি থেকে লোক এসে তাকে নিয়ে যাবে বলে!

সেদিন তারা আমাকে বুঝিয়ে ছিলো ক্ষুধা জ্বালা কি, একটা সময় কেঁদেই দিয়েছিলাম। পরে একজন ভাই তার ব্যাগ থেকে কয়েক পিস বিস্কিট দেয় তা খেয়ে কিছুটা ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করেছিলাম।

অবশেষে কোম্পানি থেকে লোক এসে একে একে সবার নাম ডাকলো, আমার নাম আসলো সবার শেষে। একটা ছোট্ট গাড়িতে ১৫ জন লোক বসানো হলো। অথচ সেখানে বসার আসন ছিলো ৮ জনের। একজন আরেক জনের উপর নিচ হয়ে বসলাম।

ভাবলাম বিদেশে মানুষ মনে হয় এভাবেই বসে। রাত তখন ১১টা ৩০ মিনিট। আমাদের একটা বাড়ির সামনে নামানো হয়েছিল। পরে সিঁড়ি বেয়ে সপ্তম তালায় উঠতে হবে। দুই হাতে লাগেজ, শরীর ক্লান্ত তবুও মনের জোরে উঠলাম।

আমাদের ১৫ জনকে একই রুমে রাখা হলো। যেখানে হয়তো কষ্ট করে হলেও ৭-৮ জন ঘুমানো যেত সেখানে ১৫ জন! ভাবলাম বিদেশে মানুষ মনে হয় এভাবেই ঘুমায়!

অবশেষে কোম্পানি আমাদের জন্য রাতের খাবার কিনলো, কিন্তু আমরা কেউ সেই খাবার খেতে পারিনি। উল্টো পেটে যাও ছিলো তাও বেরিয়ে এলো! ক্ষুধার জ্বালায় জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’চোখ দিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগলাম। আর বললাম মাগো তোমার দোয়ায় ভালো আছি মা।

এদিকে পরিবার আমার একটা ফোনের অপেক্ষায় ঘুমাতে পারেনি সারারাত। তাদের কীভাবে বোঝাবো কান্না আমাকে ঘুমাতে দেয়নি সারারাত। পরের দিন মেডিকেল করতে নিয়ে গেলো সবাইকে। সকালে ২ পিস শক্ত পরটা দেওয়া হলো সঙ্গে একটু ভাজি।

তা পেয়েও মনে হলো আকাশের চাঁদ পেয়েছি সবাই। মেডিকেল করার সময় একজন দেশি ভাইকে দেখতে পেলাম, তিনি ফোনে কথা বলছিলেন, আমি তার পাশে বসে রইলাম। তার ফোন শেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন কিছু বলবেন?

আমি চাতক পাখির মতো অশ্রুসিক্ত চোখে তাকে বলি ভাই আজ দু’দিন হলো মার লগে কথা বলি না। ১ মিনিট কথা বলতে দেবেন, তিনি ফোনটা বাড়িয়ে দিলেন আর বললেন কথা বলেন, আমি মাকে ফোন দেই।

মার ফোনে ১টা রিং বাজার সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে বললো খোকা কেমন আছিস। খেয়েছিস? বললাম তুমি কেমন করে বুঝলা আমি কল করেছি, হ্যাঁ খেয়েছি পেট ভরে আমি ভালো আছি। এখানে কোনো অসুবিধা হয় না।

তোমরা ভালো থেকো বাবার দিকে খেয়াল রেখো আমি নতুন সিম নিয়ে তোমাদের কল করবো। ৩৯ সেকেন্ডের এটাই ছিলো আমার প্রথম কথা। ধীরে ধীরে শুরু হলো জীবনযুদ্ধ। সকালে আলো ওঠার আগে বের হতাম। আর আর ফিরতাম শহর যখন ঘুমিয়ে পড়তো।

ধীরে ধীরে কিছুটা ঋণমুক্ত হলাম আর ভাবলাম এবার দেশে গিয়ে ঈদ করবো, পরে দেখলাম নিজের কাছে তেমন কিছুই নেই যে দেশে গিয়ে কয়েক মাস চলতে পারবো।

ভাবলাম সামনের বছর যাবো, বছর এসেও দেখি কিছুই নেই! এদিকে মা প্রতিদিন বলে খোকা বাড়ি আসবি কবে রে। মাকে তার উত্তর দিতে কতবার যে কেঁদেছি তা শুধু আমি জানি।

আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা অনেক স্বার্থপর হয়। অনেক গুছিয়ে মিথ্যা হাসি দিতে পারে। ভালো থাকুক প্রবাসে থাকা এমন হাজারো রেমিট্যান্সযোদ্ধা।

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১