Pallibarta.com | করোনায় এক বিপর্যস্ত পরিবারে এখন শুধুই কান্না - Pallibarta.com

বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১

করোনায় এক বিপর্যস্ত পরিবারে এখন শুধুই কান্না

বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার পাশেই সূত্রাপুর এলাকা। এ এলাকায় বসবাস মীর পরিবারের। তাঁদের বাড়িটি স্থানীয় লোকজন চেনেন ‘বড়বাড়ি’ নামে। এই বাড়িতেই বড় দুঃখ হয়ে এসেছে করোনা। একে একে ১৫ জন করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় এক দুঃসহ সময় পার করেছে পরিবারটি। তাদের মধ্যে তিন ভাই–বোন মারা যাওয়ায় শোক কাটিয়ে উঠতে পারছে না পরিবারটি।

বড়বাড়ির জ্যেষ্ঠ সদস্য নিজামুল কবীর (৭৫) বললেন, করোনাঝড়ে লন্ডভন্ড একান্নবর্তী মীর পরিবার। একসঙ্গে ১৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ১১ দিনের ব্যবধানে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। করোনায় মারা যাওয়া তিনজনই টিকা নেননি। টিকা নিলে হয়তো এমন শোকগাথা রচিত হতো না।

সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত জুন মাসের শুরুর দিকে বড়বাড়ির মেজ ছেলে মীর নজমুল ইসলাম (৬২) এবং তাঁর স্ত্রী নাহিদ সুলতানার (৫৬) করোনা শনাক্ত হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও ১৩ জন সদস্য করোনায় আক্রান্ত হন। তাঁরা হলেন মীর নজমুল ইসলামের ভাই সাইদুল ইসলাম (৫৪), আরেক ভাই মীর নজরুল ইসলাম (৭০), তাঁর স্ত্রী মমতাজ বেগম (৬২), মমতাজের দুই ছেলে মীর রাজীবুল ইসলাম (৩৮) ও মীর মনোয়ারুল ইসলাম (৪৪), রাজীবুলের স্ত্রী রিনা বেগম (২৪), মনোয়ারুলের মেয়ে রাইসা রুবাইয়া (১২), মীরবাড়ির মেয়ে সেলিনা সুলতানা (৫৬), সেলিনার বিবাহিত মেয়ে সাবিহা সুলতানা (২৭), আরেক ভাই মীর মনিরুল ইসলামের ছেলে জুলফিকার আবির (২৩), আরেক ভাই মীর বাহালুল ইসলামের স্ত্রী রাহেলা বেগম (৫৫), মেয়ে ফাতেমা আকতার (৩০) এবং ফাতেমার মেয়ে নওরিন তাসনিম (১২)। এর মধ্যে রাইসা ও নওরিন বগুড়া শহরের ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং আবীর চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশলবিদ্যার শিক্ষার্থী।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ৭ জুন শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনায় প্রথম মারা যান মীর নজমুল ইসলাম। দুদিনের মাথায় ৯ জুন করোনায় মারা যান নজমুলের ছোট বোন সেলিনা সুলতানা। বোন মারা যাওয়ার ৯ দিনের মাথায় ১৮ জুন মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আরেকভাই মীর নজরুল ইসলামের।

নজমুল ইসলাম ও নাহিদ সুলতানা দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান। পেশায় পরিবহনশ্রমিক নজমুলের উপার্জনে সংসার চলত। নজমুল করোনায় মারা যাওয়ার পর তাঁর সংসারে চরম অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। স্বামীকে হারিয়ে দিশেরা নাহিদ সুলতানা। তিনি বলেন, ‘গত এপ্রিল মাসে আমার ভাশুর (মীর বাহালুল ইসলাম) মারা যান। সেই শোক শেষ হতে না হতেই ৭ জুন করোনায় মারা যান আমার স্বামী নজমুল। আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর সঙ্গে শেষ দেখাটুকুও হয়নি।’ কথা বলতে বলতেই অশ্রু নামে নাহিদের চোখে।

করোনায় মারা যাওয়া মীর নজরুল ইসলামের নাতনি রাইসা রুবাইয়া (১২) বলে, ‘দাদু, আমার বাবা, বড় আব্বুসহ সবাই মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। আইসিইউতে থাকা দাদু বারবার আমাকে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ দেখা হয়নি তাঁর সঙ্গে।’
জুলফিকার আবীর বলেন, গত বছর জানুয়ারিতে চীনে করোনার সংক্রমণ শুরু হলে তিনি দেশে ফিরে আসেন। গত জুনে বাড়ির ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১২ জন করোনার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে গেলেও ৩ জন হেরে গেছেন। এখনো বাড়িজুড়ে শোকের ছায়া। দিনরাতে স্বজন হারানোর কান্না আর হাহাকার।

মীরবাড়ির ছোট মেয়ে মীর নাসিমা সুলতানার বসবাস বগুড়া শহরেই। তিনি বলেন, ‘দুই মাসে তিন ভাইবোনকে হারানোর শোকে বিপর্যস্ত পরিবারের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। না প্রশাসন, না জনপ্রতিনিধি। একদিকে অবরুদ্ধ বাড়িতে অনাহারী পরিবার, অন্যদিকে হাসপাতালে রোগীদের খাবার। খাবার দূরে থাক, জানাজা ও লাশ দাফনের জন্যও কেউ এগিয়ে আসেনি। শেষে আমার পরিচিত কয়েকজন বন্ধু এগিয়ে আসেন। লাশ দাফন থেকে শুরু করে অবরুদ্ধ বাড়িতে খাবার পাঠানো—সবকিছুই করেছি তাঁদের সহযোগিতায়।

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১