Pallibarta.com | ঢাবির শাহীনঃ একজন দৃষ্টিহীনের আলো ছড়ানোর গল্প - Pallibarta.com ঢাবির শাহীনঃ একজন দৃষ্টিহীনের আলো ছড়ানোর গল্প - Pallibarta.com

বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

ঢাবির শাহীনঃ একজন দৃষ্টিহীনের আলো ছড়ানোর গল্প

শাহিন আলম (২৪) পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাস্টার্স পরীক্ষা দেবেন। করোনা পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাস বন্ধ। এ সময়ে অনেকের মতো বাড়িতে বসে অবসর কাটছিল তাঁর। কিছু করার চেষ্টা থেকে ফেসবুকে ঘোষণা দেন কম্পিউটার শেখাবেন। জুটে যায় প্রশিক্ষণার্থীও। এক বছরের মধ্যে তিনি ১১৩ শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণও দিয়ে ফেলেছেন।

এমন প্রশিক্ষণ তো অনেকেই দেন। তবে ঝিনাইদহের মহেশপুরের শাহিন আলমের বিশেষত্ব হচ্ছে তিনি নিজে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, প্রশিক্ষণও দেন দেশ–বিদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের। আর অনলাইন মাধ্যমে এ প্রশিক্ষণ দিতে তিনি কোনো পয়সাও নেন না।

মহেশপুরের আলামপুর গ্রামের কৃষিশ্রমিক আবদুল কাদেরের ঘরে জন্ম নেওয়া শাহিন দৃষ্টিশক্তি হারান ১৩ বছর বয়সে। এরপর শাহিনের এ অবস্থানে আসতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। কিন্তু একজন অদম্য মেধাবীর মতোই তিনি পাড়ি দিয়েছেন জীবনের প্রতিটি বাধা। এখন বাধা পেরোতে নিজেই সাহায্য করছেন অন্যদের। সাইদুর রহমান নামে শাহিনের আরেক ভাই রয়েছে। তিনি ঢাকায় একটি কোম্পানিতে সামান্য বেতনে চাকরি করেন। মা মিনারা বেগম ঘর সামলান।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রচণ্ড জ্বর আসে শাহিনের। চিকিৎসকেরা জানান টাইফয়েড। এরপর জ্বর সেরে গেলেও চোখে কম দেখতে শুরু করেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যে তাঁর চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। ১৩ বছর বয়স থেকে তিনি পুরোপুরি দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন। তখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।

দেখতে পান না বলে পড়ালেখার আগ্রহ তাঁর মধ্যে এতটুকু কমেনি। তবে ছাড়তে হয় সাধারণ স্কুল। দুই বছর পড়ালেখা বন্ধ থাকার পর নড়াইলে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের আওতাধীন সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কার্যক্রমের বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানকার তুলারামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে মাধ্যমিক পাস করেন। এলাকায় ফিরে ভর্তি হন শামছুল হুদা খান কলেজে। এ সময় কিছু শিক্ষক তাঁকে নিতে চাননি। পরে নিজের পড়ালেখার সব ব্যবস্থা নিজেই করার প্রতিশ্রুতি দিলে কলেজে পড়াশোনার সুযোগ মেলে। বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের কলেজে হেঁটেই যাতায়াত করতেন শাহিন আলম। ২০১৫ সালে এই কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন।

শামছুল হুদা খান কলেজের অধ্যক্ষ এ বি এম শাহ আলম বলেন, শাহিন অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা করেছে।

এইচএসসির পর তাঁর স্বপ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। কিন্তু টাকার অভাবে ভর্তি কোচিং করতে পারেননি। যেসব বন্ধু কোচিং করেছে, তাদের থেকে নোট ও সহযোগিতা নিয়ে প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন। ভর্তির পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান করে নেন। ধারদেনা করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। ব্রেইল পদ্ধতি ব্যবহার করে পড়ালেখা শুরু করেন। শাহিনের কোনো কম্পিউটার ছিল না, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রিসোর্স সেন্টারের কম্পিউটার নিজের পড়ালেখার কাজে ব্যবহার করতেন। পাশাপাশি অন্যদেরও নানান বিষয় শেখাতেন।

শাহিন আলম জানান, পড়ালেখার ফাঁকে তিনি কম্পিউটার চালানো শিখেছেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের একটি প্রকল্পে প্রশিক্ষকও ছিলেন। তাঁর মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ দিতেন তিনি। গত বছরের মার্চে করোনা দেখা দিলে তিনি বাড়ি আসেন। একপ্রকার বসেই তিন মাস কেটে যায়। তখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করেন। জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনা পয়সায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণ করানোর ঘোষণা দেন। পাশাপাশি কিছু পরিচিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষকেও মুঠোফোনে বিষয়টি জানান। ওই মাস থেকেই বাড়িতে বসে তাঁর কম্পিউটার প্রশিক্ষণ শুরু হয়।

সপ্তাহে শুক্র, রবি ও বুধবার সন্ধ্যায় দেড় ঘণ্টা করে ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। তিন মাসের কোর্সের প্রথম ব্যাচে শিক্ষার্থী ছিলেন ৬০ জন। দ্বিতীয় ব্যাচে অংশ নেন ৫৩ জন। জুন মাসে দ্বিতীয় ব্যাচ শেষে এখন তৃতীয় ব্যাচ শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন শাহিন। জুমের মাধ্যমে শাহিন এ প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাঁর এ প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন।

শাহিন প্রশিক্ষণার্থীদের ফান্ডামেন্টাল অব কম্পিউটার, স্ক্রিন রিডার, মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, মাইক্রোসফট এক্সেল, মাইক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্ট, ইন্টারনেট ব্রাউজিং ইত্যাদি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। জব অ্যাকসেস উইথ স্পিচ (জেএডব্লিউএস) ও নন ভিজ্যুয়াল ডেক্সটপ অ্যাকসেস (এনভিডিএ) সফটয়্যার ব্যবহার করে ভয়েসের মাধ্যমে তিনি এ প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষণার্থীরাও একই পদ্ধতি ব্যবহার করেন।

মাদারীপুরের বাসিন্দা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইমরান শরিফ থাকেন ঢাকার খিলক্ষেতে। তিনি ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরে দ্বিতীয় ব্যাচে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ঘরে বসে জুম সফটওয়্যারের মাধ্যমে তিনি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণে কম্পিউটার চালানো অনেকটা শিখতে পেরেছেন।

কক্সবাজার সরকারি কলেজের বিএ শেষ বর্ষের ছাত্রী তাসলিমা খাতুন জানান, কোনো টাকা ছাড়াই তিনি এ প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। এটা তাঁর জীবন গঠনে সহায়ক হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র গাইবান্ধার মাইদুল ইসলাম বলেন, করোনায় বাড়িতে বসেই সময় যাচ্ছিল। ঠিক সেই সময় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য একটা বড় পাওয়া।

ভারতের উত্তর দিনাজপুরের গালিমাদহ গ্রামের প্রকাশ দাস জানান, তিনি দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ালেখা করছেন। ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরে তিনি অনলাইনে নিবন্ধন করেন। শাহিন আলমের কাছে নিয়মিত কম্পিউটার শিখছেন।

শাহিন আলম বলেন, প্রথম ব্যাচ নিজের উদ্যোগে পরিচালনা করেছেন। এরপর দ্বিতীয় ব্যাচে অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন নামের একটি সংগঠন তাঁকে জুম ব্যবহারের ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণার্থীদের সনদ দিয়ে সহযোগিতা করছে। তবে তৃতীয় ব্যাচে কী হবে, তিনি তা জানেন না। আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় ইন্টারনেট বিলটা তাঁর জন্য চাপ হয়ে যাচ্ছে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রিসোর্স সেন্টারের দায়িত্বে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা (দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী) মো. মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শাহিন আমাদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রিসোর্স সেন্টারে থাকা বিশেষ সফটওয়্যারসংবলিত কম্পিউটার ব্যবহার করে কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ শিখেছেন।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. ফেরদৌস হোসেন বলেন, শাহিনকে আলাদাভাবে কোনো আর্থিক সহায়তা করা হয়নি। তবে প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন কারণে সমস্যায় থাকা শিক্ষার্থীদের বিভাগ থেকে আর্থিক সহায়তা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০