Pallibarta.com | এই মৃত্যুর দায় কে নেবে? - Pallibarta.com

বুধবার, ১৮ মে ২০২২

এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?

এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ছাত্রদের দিনভর মারামারিতে প্রাণ গেল একজন নিরীহ মানুষের। নাহিদ হোসেনের মৃত্যুতে হয়তো পরিবারটিই পথে বসবে। এর দায় কে নেবে? বুধবার সকাল থেকে নিউ মার্কেট এলাকায় কিছুটা উত্তেজনা থাকলেও পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক। যানবাহন চলছে। তবে পুরো ঘটনার নানা দিন নিয়ে আলোচনা সমালোচনা কিন্তু সরব।

ভয়বহ সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা, ব্যবসায়ীদের অতি বাড়াবাড়ি, উভয় পক্ষের মধ্যে সহিষ্ণুতার অভাব, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, জনপ্রতিনিধিদের দায় এসব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বুধবার দেশের প্রায় সবকটি গণমাধ্যমে পুরো ঘটনায় পুলিশের ব্যবসায়ীদের পক্ষ নেয়ার বিষয়ে সমালোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও একই চিত্র। যা কারো কাম্য হতে পারে না। সর্বোপরি কথা হলো এরকম ঘটনায় আমরা সবাই কি চুপ করে থাকবো? কারো কি কোন দায় নেই?

তুচ্ছ বিষয় নিয়ে উভয় পক্ষ দিনভর মুখোমুখি সংঘর্ষ চালিয়ে যাবে, যানজটে অচল হবে রাজধানী, নাগরিক দুর্ভোগ চরমে উঠবে- রোজার দিনে এমন দৃশ্য দেশবাসী দেখতে চাননি। যে কোনো সংঘর্ষে দু’পক্ষের সহনশীলতার অভাব থাকে। এখানেও ছিল। তারপরও ঢাকা কলেজের শিক্ষকদের চেষ্টা করতে দেখা গেছে বিষয়টি থামানোর। তারা চেষ্টা করতে গিয়ে বেপরোয়া ব্যবসায়ীদের হামলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু অন্যপক্ষ থেকে, ব্যবসায়ী নেতাদের কিন্তু মধ্যস্থতা করতে দেখা যায়নি

ঢাকা কলেজ বন্ধ থাকলে নিউ মার্কেট কেন খোলা থাকবে?’, ‘নিউ মার্কেট এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানাই’, ‘নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা উগ্র। জিনিসের দাম জিজ্ঞাসা করলেই নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে, না-নিলে গালাগালি দেয়’, ‘পুলিশের ভূমিকা ব্যবসায়ীদের পক্ষে কেন?’
মঙ্গলবার দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এভাবেই নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছেন। কারণ হলো ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিউ মার্কেটসহ আশেপাশের ব্যবসায়ীদের সোমবার মধ্যরাত থেকে সংঘর্ষের ঘটনা। থেমে থেমে যখন ঘংঘর্ষ ২০ ঘণ্টা অতিক্রম করছিল, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ক্ষুব্ধ নাগরিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

রাতে একজন নিজের ওয়ালে লিখেছেন: ‘এটি একটি বিদ্যাপীঠ। এখানে জ্ঞানের আলোর মশাল জ্বেলে সূর্যোদয় হয়, এখানে নতুন সভ্যতার ফুল ফোটানো হয়। হে জনগণের বন্ধু, সেবক, আপনি কাকে গুলিবিদ্ধ করছেন? ভুল করছেন না তো!’ এই স্ট্যাটাস যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছিল এর আগে ঢাকা কলেজের ভেতরে টিয়াল শেল ছুঁড়ছিল পুলিশ। এই ছবিটি রীতিমতো ভাইরাল এখন সোশ্যাল মিডিয়ায়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ফাস্ট ফুডের দুই দোকান কর্মচারীর বিবাদ এবং একে অপরকে দেখে নেওয়ার জন্য কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ডেকে আনলে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এরপর সোমবার মধ্যরাতে দোকান কর্মচারীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রায় আড়াই ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে। পুলিশের হস্তক্ষেপে রাত আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা রাতের ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মানববন্ধন করতে রাস্তায় জড়ো হয়। এ সময় ব্যবসায়ীরাও বেরিয়ে এলে সংঘর্ষ শুরু হয়।

মঙ্গলবার দিনভর দেশের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা এটি। একটি সাধারণ বিষয়কে কেন্দ্র করে এত বড়ো ঘটনা কাম্য হতে পারে না। তাছাড়া সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো আগের দিন মধ্যরাতে শুরু হওয়া ঘটনা পরের দিন রাত অবধি কোনো অবস্থাতেই চলতে পারে না। যেহেতু ঘটনা এ সময় পর্যন্ত গড়িয়েছে সেহেতু যাদের পরিস্থিতি শান্ত করার কথা ছিল তারা সঠিক পদক্ষেপ নেননি বা ব্যর্থ হয়েছেন এমন অভিযোগ তোলা কি অমূলক হবে? সুষ্ঠু পরিকল্পনারও অভাব থাকতে পারে। নাকি এর ভেতরে আরো কিছু কারণ থাকতে পারে। যদি থাকে তাহলে নিশ্চয়ই তা তদন্তের দাবি রাখে।

তুচ্ছ বিষয় নিয়ে উভয় পক্ষ দিনভর মুখোমুখি সংঘর্ষ চালিয়ে যাবে, যানজটে অচল হবে রাজধানী, নাগরিক দুর্ভোগ চরমে উঠবে- রোজার দিনে এমন দৃশ্য দেশবাসী দেখতে চাননি। যে কোনো সংঘর্ষে দু’পক্ষের সহনশীলতার অভাব থাকে। এখানেও ছিল। তারপরও ঢাকা কলেজের শিক্ষকদের চেষ্টা করতে দেখা গেছে বিষয়টি থামানোর। তারা চেষ্টা করতে গিয়ে বেপরোয়া ব্যবসায়ীদের হামলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু অন্যপক্ষ থেকে, ব্যবসায়ী নেতাদের কিন্তু মধ্যস্থতা করতে দেখা যায়নি। দেখা যায়নি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদেরও। তারাও তো দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারতেন। দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে আমরা কেন এতোটা উদাসীন এ প্রশ্নের জবাব কার কাছে চাইব বা কে দেবে?

এই ঘটনায় ব্যবসায়ীরা কতোটা বেপরোয়া ছিল তার উদাহরণ সাংবাদিকদের ওপর তাদের আক্রমণ। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা ব্যবসায়ীদের হামলার শিকার হয়েছেন। অন্তত ১০জন গণমাধ্যমকর্মীকে আহত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছে গণমাধ্যম। তাই এই নগ্ন হামলা। যা স্বাধীন সাংবাদিকতায় হস্তক্ষেপ। আইনের দৃষ্টিতেও অপরাধ। সাংবাদিকদের ওপর ব্যবসায়ীদের হামলার ভিডিও ফুটেজ, ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। আশাকরি অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হবে।

আরেকটি বিষয় আলোচিত হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে যখন দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয় তখন ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি কম ছিল। অনেকে অভিযোগ করেছেন নির্বিকার ভূমিকা পালন করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ব্যবসায়ীদের না-সরিয়ে পুলিশ কেন ছাত্রদের প্রতি মারমুখি হলো এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। ক্ষোভ ঝরেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। পুলিশের কর্মকর্তাদের এ কারণে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তারা নিজেদের মতো করে দায় এড়ানোর বক্তব্য দিয়েছেন। এতে সন্তুষ্টির কোন সুযোগ নেই। কেন পুলিশ এ কাজটি করেছে? এ নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। যদিও শিক্ষামন্ত্রী পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন।

সাধারণত দেখা যায় শিক্ষার্থীরা বয়সের কারণে এসব ইস্যুতে উত্তেজিত হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে যে বেপরোয়া আচরণ করেছে তা খুব একটা দেখা যায় না। হঠাৎ করে তারা এভাবে মারমুখি কেন হলো? পেছনের শক্তি আসলে কোথায় অনুসন্ধান করা উচিত। ঢাকা কলেজের পাশে সিটি কলেজ, ইডেন কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বড় বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই ইস্যুতে বসে থাকার কথা নয়। তারাও পর্যায়ক্রমে ছাত্রদের পক্ষে দাঁড়াবে- এটাই স্বাভাবিক। তারুণ্যের শক্তির কাছে সব সময় অন্য শক্তিগুলো পিছু হটে, বা পরাজিত হয়। এবার কিন্তু ব্যতিক্রম আলামত মিলেছে।

মঙ্গলবার বিকালে ছাত্রদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। নির্দেশনা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনরত ছাত্ররা ঘোষণা দিলো- ‘জীবন দেব, তবুও হল ছাড়ব না’। হঠাৎ করেই ছাত্রদের হল ছাড়তে বলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সামনে ঈদ। সবারই এ নিয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা থাকে। তাছাড়া প্রতিষ্ঠান এভাবে বন্ধ করে দেওয়ার পর আমরা কখনও দেখিনি কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব নিয়ে ছাত্রদের বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে। তারা নির্দেশ দিয়েই খালাস। সেই ছাত্র পড়ন্ত বিকেলে কীভাবে বাড়ি যাবে এ দায় যেন তাদের নেই।

এই সংকটের সমাধান হবে- এটা নিশ্চিত। কারণ ঈদের আগে এ ধরনের ঘটনা ব্যবসায়ীদেরই বেশি ক্ষতি করছে। সুতরাং তাদের আরো নমনীয় হওয়া উচিত ছিল। শিক্ষকরা যখন সমাধানে এগিয়ে এসেছিলেন তখন তাদেরও সাড়া দেওয়া উচিত ছিল। এখন শিক্ষার্থীদের দাবি হামলাকারী ব্যবসায়ীদের বিচার করতে হবে। গণমাধ্যমকর্মীরাও তাদের যারা হামলা করেছে তাদের বিচার চাইছেন। এসব দাবির কোনোটাই অযৌক্তিক নয়। দাবি পূরণে নীতি নির্ধারকরা আন্তরিক হবেন বলে বিশ্বাস করি। তেমনি ঈদকে সামনে রেখে স্বাভাবিক ব্যবসায়ীক কর্মকাণ্ড যেন চালু হয় সেদিকটাও দেখতে হবে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে যেসব প্রশ্ন ওঠেছে তাও সবার কাছে পরিষ্কার করা উচিত। তা না হলে নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকেই যাবে।

২০ এপ্রিল ২০২২
লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
rajan0192@gmail.com

সূএ : জাগো নিউজ

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১