Pallibarta.com | আরো বারো মডেল নজরদারিতে, যেকোনো সময় গ্রেফতার!

সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১

আরো বারো মডেল নজরদারিতে, যেকোনো সময় গ্রেফতার!

আলোচিত-সমালোচিত দুই মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌকে গ্রেপ্তারের পর দেশের শোবিজ অঙ্গনে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। তাদের গ্রেপ্তারের পর আরও কমপক্ষে একডজন মডেলকে আনা হয়েছে পুলিশের নজরদারির আওতায়। তারা কোথায় যাচ্ছেন বা কী করছেন তা পর্যবেক্ষণ করছে পুলিশ। পিয়াসা ও মৌয়ের মতো এসব কথিত মডেলও সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ এসেছে। ইতিমধ্যে তাদের তালিকা করা হয়েছে। অন্যদিকে নজরদারির বিষয়টি আঁচ করতে পেরে এসব মডেলের কেউ কেউ গ্রেপ্তার এড়াতে ‘ওপরের মহলে’ তদবির চালাচ্ছে বলে পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার পিয়াসা ও মৌকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া রিমান্ডের প্রথম দিন পার হয়েছে। তাদের দুজনকে মুখোমুখি করে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তারা। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতানোর কথা স্বীকার করেছেন। পিয়াসা তার বাসায় মাদকের আসর বসা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তার মোবাইল ফোনেও মিলেছে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ছবি ও ভিডিও ক্লিপ। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা জানান, পিয়াসা ও মৌকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে শোবিজ জগতের আর কারা কারা তাদের চক্রে জড়িত তা বের করার চেষ্টা চলছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের আরও তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগীর নাম পেয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তাদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া পিয়াসা ও মৌয়ের মতোই আরও একডজন মডেল আছেন। তারা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের টার্গেট করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। ওইসব মডেল গুলশান, বারিধারা, উত্তরা ও ধানমন্ডি এলাকায় থাকেন। ইতিমধ্যে তাদের তালিকা করে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তালিকাভুক্ত মডেলরা কী করছেন বা কোথায় যাচ্ছেন তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য পাওয়ার পর তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। পিয়াসা ও মৌও ওইসব মডেলের বিষয়ে তথ্য দিচ্ছেন। তবে তাদের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

পিয়াসা-মৌয়ের বাসায় যাতায়াতকারী ধনীর দুলালদের তালিকা : তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, পিয়াসা ও মৌয়ের বাসায় মাদকের আসরে নিয়মিত অংশগ্রহণকারী বিত্তবান ব্যবসায়ী এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সন্তানদের তালিকা পেয়েছে গোয়েন্দারা। পিয়াসা ও মৌকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এ তালিকার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে পিয়াসা জানিয়েছেন, তার বাসায় মদ পৌঁছে দিতেন ধনাঢ্য কয়েকজন ব্যবসায়ী। তারা গুলশান ক্লাব থেকে প্রয়োজনীয় মদ পেতেন।

প্রকল্পের নামে পিয়াসা হাতিয়ে নিয়েছেন ৮ কোটি টাকা : পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রামেই জন্ম ও মডেলিংয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল পিয়াসার। ২০০৯ সাল থেকে ঢাকার অভিজাত মহলে পরিচিতি পান মডেল পিয়াসা হিসেবে। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ৩২ বছর বয়সী পিয়াসার হাত হয়ে উঠে অনেক লম্বা। তাকে সমীহ করে চলেন অনেক শিল্পপতিও। অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজারে হোটেল হোয়াইট সেন্ট নামের একটি প্রকল্পের কথা বলে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন সাড়ে আট কোটি টাকা। প্রকল্পের গালগল্পে ভুলিয়েছেন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বারিধারা আবাসিক এলাকার ৯ নম্বর রোডের একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকতেন পিয়াসা। সার্ভিস চার্জ ও সিকিউরিটি বিল বাদে শুধু ফ্ল্যাট ভাড়াই দেড় লাখ টাকার মতো। অথচ দৃশ্যমান কোনো আয় নেই পিয়াসার। বিশাল ফ্ল্যাটে তিনি একাই থাকেন। তার রান্না করাসহ ব্যক্তিগত কাজের জন্য কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া আছে। শাহজাহান নামে এক বাবুর্চি তার ফ্ল্যাটে রান্নার কাজ করেন। তাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।’

ডিএমপির ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পিয়াসার ফ্ল্যাটে প্রভাবশালীদের যাতায়াত ছিল নিয়মিত। করোনা পরিস্থিতিতে পাঁচতারকা হোটেলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে নিয়মিত পার্টি হতো তার ফ্ল্যাটেই। ইয়াবা ও মদপানের সব আয়োজন থাকত সার্বক্ষণিক। কোটি টাকা দামের তার ব্যক্তিগত গাড়ি আছে। পিয়াসার বাবার নাম মাহবুব আলম। তিনি কাস্টমস কর্মচারী ছিলেন। পিয়াসার শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি পাস হলেও নিজেকে কখনো এমবিএ ডিগ্রিধারী আবার কখনো ব্যারিস্টার বলে পরিচয় দিয়ে আসছিলেন। তিন বোনের মধ্যে পিয়াসা থাকেন ঢাকায়। অন্যরা থাকেন চট্টগ্রামে।’

প্রেমের ফাঁদে পা দিয়েছেন অনেকেই : পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তরুণ-যুবকদের নিয়ে পিয়াসা রাতভর পার্টি করতে পছন্দ করতেন। এসব পার্টিতে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, বড় সরকারি চাকরিজীবী ও রাজনীতিকদের সন্তানরা আসত। রাতভর পার্টি থেকে কয়েক লাখ টাকা আয় হতো পিয়াসার। পিয়াসার বারিধারার ফ্ল্যাটে প্রতিদিনই বসত এমন আসর। সন্ধ্যার পর থেকে ওই বাসায় আসত অতিথিরা। শুধু পার্টি করার জন্য কয়েক লাখ টাকা অগ্রিম ও ভাড়া দিয়ে পিয়াসা এই বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। বাসার ভেতরে ছিল দেশি-বিদেশি মাদকের ছড়াছড়ি। পিয়াসার মূল টার্গেট ছিল টাকাওয়ালা ব্যক্তিরা। যাদের টার্গেট করে প্রেমের ফাঁদে ফেলত পিয়াসা নিজেই। তারপর তাদের আমন্ত্রণ জানাত তার বাসার পার্টিতে। যারা আসত তাদের নেশায় বুঁদ করে ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে অচেতন করত পিয়াসার সহযোগীরা। কখনো কখনো পিয়াসা নিজেই অচেতন ব্যক্তিদের বস্ত্রহীন করে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণের কাজটি করত। আবার কখনো তার সহযোগী অন্য মডেলদের দিয়ে এই কাজ করাত। ব্ল্যাকমেইল করার মূল অস্ত্রই ছিল তার এসব ছবি-ভিডিও ক্লিপ। অভিযানে পিয়াসার যে চারটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে সেগুলোতে অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তির ছবি-ভিডিও ক্লিপ মিলেছে।

ব্যবসায়ীর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মৌয়ের অভিযোগ : গ্রেপ্তারের পর গাড়িতে তোলার সময় মৌ সাংবাদিকদের বলতে থাকেন, ‘আমাকে ষড়যন্ত্র করে মদ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন এক শিল্পপতির মালিকের স্ত্রী। ওর মাধ্যমেই পিয়াসার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সম্প্রতি ওদের মধ্যে কারোর সঙ্গে একটা ঝামেলা হয়েছে, যেটাতে আমাকে সন্দেহ করে হুমকি দেন, সেটাই হয়েছে।’

মৌয়ের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিল্পপতি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা কীভাবে সম্ভব? পুলিশের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা কি কারোর কথা বা ইন্ধনে মদ, বিয়ার হাতে করে নিয়ে গিয়ে এভাবে কাউকে ফাঁসায়? আপনারা গণমাধ্যমের কর্মীরাই তো ওই রাতের প্রত্যক্ষদর্শী। আমরা দেখেছি টিভিতে আপনাদের উপস্থিতিতেই সেই রাতে মৌয়ের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে একের পর এক বোতল বের করা হয়েছে। এমন তো নয় পুলিশ গোপনে অভিযান চালিয়েছে। পুলিশ তো স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই তাকে মাদকসহ গ্রেপ্তার করেছে। আসলে এগুলো সবই তার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা। হয়তো কোনো এক অনুষ্ঠানে আমার স্ত্রীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। পরে কিছু হাতানোর জন্য তাকে ঘায়েল করতেই এমন দোষারোপ করছে।’

পুলিশের বক্তব্য : ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ডিবি-উত্তর) হারুন অর রশীদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিয়াসা ও মৌকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে বিস্তর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। দুজনই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে অনেক ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ পেয়েছি। দুজনের মধ্যে পিয়াসার চলাফেরা ছিল বেপরোয়া। টার্গেট পূরণ না হলেই অন্যদের ফাঁসানোই ছিল তার কাজ। এসব ঘটনার সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত আছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।’

অভিনয় শিল্পী সংঘের প্রতিবাদ : গতকাল অভিনয় শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব নাসিম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত পরিচয়, প্রভাব, কখনো বাহ্যিক সৌন্দর্য, কিছু ক্ষেত্রে কপালের জোড়ে দু-একটি বিজ্ঞাপন বা নাটকে কাজ করলেই তাকে মডেল বা অভিনেত্রী বলা যায় কি না সেই ভাবনাটা জরুরি হয়ে উঠছে। একজন ব্যক্তির নামের আগে তকমা জুড়ে দেওয়ার আগে তার কাজের বিষয়টি খতিয়ে দেখাও বিবেচ্য হওয়া জরুরি মনে করছে সংগঠনটি।

আরো পড়ুন ...

আর্কাইভ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০